পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে এনবিএল হাজী লুৎফর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা নিয়ে গড়মিলের অভিযোগের অনুসন্ধানে গিয়ে মিলেছে একের পর এক অসঙ্গতি। ক্লাস চলাকালে একাধিক শ্রেণিকক্ষ শিক্ষকশূন্য পাওয়া গেছে। এছাড়া কাগজে-কলমে দেখানো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার সঙ্গে বাস্তব চিত্রেরও বড় ধরনের অমিল মিলেছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে সরেজমিনে সদর ইউনিয়নের দহলাখাগড়াবাড়ি এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের ক্লাস রুটিন অনুযায়ী চতুর্থ ঘন্টায় সহকারী শিক্ষক ফজলে রাব্বীর নবম শ্রেণিতে ভূগোল, কৃষ্ণ প্রসাদ রায়ের দশম শ্রেণিতে ভূগোল, শাহ আলমের অষ্টম শ্রেণিতে ধর্ম এবং মোকছেদুল হকের ষষ্ঠ শ্রেণিতে গণিত ক্লাস ছিল। অথচ শ্রেণিকক্ষে না গিয়ে অফিসকক্ষে বসে থাকতে দেখা যায় সহকারী শিক্ষক শাহ আলম, কৃষ্ণ প্রসাদ রায় ও মোকছেদুল হককে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দাপ্তরিক কাজে রংপুরে ছিলেন এবং সহকারী শিক্ষক ফজলে রাব্বী ছুটিতে ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষক নেই। শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছে, আবার কেউ কেউ স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। তাদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানায়, চতুর্থ ঘন্টায় কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে আসেননি।
অন্যদিকে দশম শ্রেণিতে সহকারী শিক্ষক দিপেন্দ্র নাথ রায় তিনজন শিক্ষার্থী নিয়ে বাংলা ক্লাস নিচ্ছিলেন। অথচ রুটিন অনুযায়ী ওই সময় তার সপ্তম শ্রেণিতে আইসিটি ক্লাস নেওয়ার কথা ছিল। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমার তৃতীয় ঘন্টায় দশম শ্রেণিতে বাংলা ক্লাস ছিল। কিন্তু সে সময় আমি সপ্তম শ্রেণিতে আইসিটি ক্লাস নেই। তাই চতুর্থ ঘন্টায় এখন দশম শ্রেণিতে বাংলা ক্লাস নিচ্ছি।
চতুর্থ ঘন্টায় ক্লাস না নিয়ে অফিসকক্ষে বসে থাকার কারণ জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক কৃষ্ণ প্রসাদ রায় বলেন, আমি সকালে ক্লাস নিয়েছি। হঠাৎ করে শরীর খারাপ হওয়ায় চতুর্থ ঘন্টায় ক্লাসে যেতে পারিনি।
এদিকে সহকারী শিক্ষক শাহ আলম দাবি করেন, তিনি চতুর্থ ঘন্টায় ক্লাস নিয়েছেন। তবে কোন শ্রেণিতে ক্লাস নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। চতুর্থ ঘন্টা দুপুর ১২টা ২০ মিনিট থেকে ১টা পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও ১ টার আগেই অফিসকক্ষে বসে আছেন কীভাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি ৫/১০ মিনিট আগেই ক্লাস থেকে এসেছি।
অন্যদিকে সহকারী শিক্ষক মোকছেদুল হকের চতুর্থ ঘন্টায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে গণিত ক্লাস নেওয়ার কথা থাকলেও তাকে অফিসকক্ষে পাওয়া যায়। চতুর্থ ঘন্টায় কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে গণিত ক্লাস নিয়েছেন। পরে তাকে সঙ্গে নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে গেলে শিক্ষার্থীরা জানায়, তিনি চতুর্থ ঘন্টায় নয়, তৃতীয় ঘন্টায় ক্লাস নিয়েছেন।
এরপর তিনি জানান, চতুর্থ ঘন্টায় তিনি দশম শ্রেণিতে ছিলেন। অথচ ওই সময় দুপুর ১২টা ২০ মিনিট থেকে ১টা পর্যন্ত দশম শ্রেণিতে বাংলা ক্লাস নিয়েছেন সহকারী শিক্ষক দিপেন্দ্র নাথ রায়। একই সময়ে একই শ্রেণিতে দুইজন শিক্ষক কীভাবে ক্লাস নিলেন-এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
অনুসন্ধানে শিক্ষার্থী সংখ্যা নিয়েও গড়মিলের তথ্য পাওয়া যায়। বিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৭৮ জন। তবে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাস্তবে এ সংখ্যা ১১০ থেকে ১১৫ জনের বেশি নয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, দশম শ্রেণিতে ৫১ জন শিক্ষার্থীর কথা বলা হলেও উপস্থিত ছিল মাত্র ৩ জন। শিক্ষার্থীরা জানায়, বাস্তবে ওই শ্রেণিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ২৫ জন। নবম শ্রেণিতে ৬৫ জনের বিপরীতে উপস্থিত ছিল ৯ জন, অথচ বাস্তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ২০ জন। অষ্টম শ্রেণিতে ৬০ জন দেখানো হলেও উপস্থিত ছিল ৭ জন, বাস্তবে প্রায় ২০ জন। সপ্তম শ্রেণিতে ৫২ জনের বিপরীতে উপস্থিত ছিল ৮ জন, বাস্তবে প্রায় ১৮ জন। আর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৫০ জন শিক্ষার্থী দেখানো হলেও উপস্থিত ছিল ৯ জন, বাস্তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩০ জন বলে জানায় শিক্ষার্থীরা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে এনবিএল হাজী লুৎফর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে পাঠদানের অনুমতি, ২০১৯ সালে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি, ২০২৩ সালে এমপিওভুক্তি এবং ২০২৪ সালে মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায় প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষকসহ মোট শিক্ষক সংখ্যা ১৬ জন। তবে সরেজমিনে উপস্থিত পাওয়া গেছে মাত্র ৫ জনকে।
শিক্ষা দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, নীতিমালা অনুযায়ী মফস্বল এলাকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সর্বনিম্ন ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হয়। তবে এনবিএল হাজী লুৎফর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৫ সালে শিক্ষা অফিসে পাঠানো তথ্যে বিদ্যালয়টি ১৮৮ জন শিক্ষার্থী দেখায়। অথচ ওই বছরের বার্ষিক পরীক্ষায় ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত অংশগ্রহণ করে ৭০ জন শিক্ষার্থী এবং এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ জন। অর্থাৎ মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৮৮ জন। শিক্ষা দপ্তরের ওই সূত্রের দাবি, বিদ্যালয়টির দেখানো শিক্ষার্থী সংখ্যার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নূর কুতুবে আলমের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি নিজেকে একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক দাবি করেন। প্রতিবেদককে সরাসরি দেখা করতে বলেন। মুঠোফোনে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
অনিয়মের বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের উপ-পরিচালক মোছা. রোকসানা বেগমের সরকারি মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ না করায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বার্তা বাজার/এস এইচ






