যে ভবন হবে ধর্মীয় শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক সম্প্রীতির আধুনিক কেন্দ্র, সেই ভবন নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। উদ্বোধনের আগেই দেখা দিয়েছে ফাটল।
১২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন কোটালীপাড়া মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের এই বেহাল অবস্থা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের দেয়াল ও প্লাস্টারের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় ফাটলের চিহ্ন স্পষ্ট। কোথাও পুরোনো প্লাস্টার কেটে নতুন করে সিমেন্ট লাগানো হচ্ছে। উদ্বোধনের আগেই এমন সংস্কার কাজ স্থানীয়দের মনে নির্মাণের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিস্ময়ের বিষয়, সরকারি প্রকল্পে বাধ্যতামূলক তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড থাকার কথা থাকলেও মসজিদ প্রাঙ্গণে এমন কোনো সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ, ব্যয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংবা বাস্তবায়নকারী সংস্থার তথ্য সাধারণ মানুষের অজানাই থেকে গেছে।
দেড় বছরের প্রকল্প, পেরিয়ে গেছে প্রায় সাত বছর জানা যায়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০১৯ সালে কোটালীপাড়া মডেল মসজিদের কাজ শুরু হয়। যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী ১৮ মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় সাত বছরেও নির্মাণ শেষ হয়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তর জানায়, প্রথম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পুরোনো ভূমি অফিস অপসারণে বিলম্ব এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে কাজ ছেড়ে দেয়। পরে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এমডি বদরুল ইকবাল লিমিটেডকে নতুন কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্মাণের মেয়াদকাল দুই বছর পার হলেও এখনও কাজ শেষ হয়নি।
স্থানীয় মুসল্লিদের অভিযোগ, শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির অভাবে প্রকল্পটি বারবার পিছিয়েছে। তাদের দাবি, কাজের মান নিশ্চিত করতে গণপূর্ত বিভাগের কার্যকর নজরদারি ছিল না বলেই আজ উদ্বোধনের আগেই ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে।
একাধিক মুসল্লি বলেন, আল্লাহর ঘর উদ্বোধনের আগেই যদি ফেটে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এর নিরাপত্তা নিয়ে আমরা কীভাবে নিশ্চিন্ত থাকব।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমডি বদরুল ইকবাল লিমিটেডের ম্যানেজার মাসুম বিল্লাহ বলেন, কলাম বা বিমে কোনো কাঠামোগত সমস্যা নেই। প্লাস্টারে ফাটল দেখা দিয়েছে, যা রিপেয়ার করা সম্ভব। আমরা তা করে দিচ্ছি। সাইট নিয়ে নানা জটিলতা ছিল। ২০২৩ সালের জুনে পুরোপুরি কাজ শুরু করি। বর্তমানে প্রায় তিন কোটি টাকার বিল বকেয়া রয়েছে। শ্রমিকদের নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে না পারায় কাজ ধীরগতিতে চলছে। বকেয়া টাকা পেলে দুই মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাগুফতা হক বলেন, ফাটলের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আমি এখানে যোগদানের পর থেকেই মসজিদটি একই অবস্থায় দেখছি। আগের জেলা প্রশাসকও ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য একাধিকবার তাগিদ দিয়েছিলেন, কিন্তু তারা তা করতে পারেনি।
গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম খান বলেন, জুন মাসের ব্যস্ততার কারণে এখনো সরেজমিনে যেতে পারিনি। ঠিকাদারের প্রকৌশলীকে ফাটলগুলো রিপেয়ার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যস্ততা শেষে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখব।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, এই মডেল মসজিদে নারী-পুরুষের পৃথক নামাজ ও অজুর ব্যবস্থা, ইসলামিক লাইব্রেরি, গবেষণা কেন্দ্র, হেফজ শিক্ষা, হজ প্রশিক্ষণ, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা, ইমাম প্রশিক্ষণ, অতিথিশালা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস থাকার কথা। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা ও নির্মাণ ত্রুটির কারণে এসব সুবিধা থেকে বছরের পর বছর বঞ্চিত কোটালীপাড়ার মানুষ।
কোটালীপাড়া কল্যাণ সংঘের সভাপতি সোহেল শেখ বলেন, প্রায় সাত বছরের বিলম্ব, দুই দফা ঠিকাদার পরিবর্তন, উদ্বোধনের আগেই ভবনে ফাটল, প্রকল্পের তথ্য ফলক অনুপস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সীমিত তদারকি—সব মিলিয়ে কোটালীপাড়া মডেল মসজিদ এখন শুধু একটি নির্মাণাধীন ভবন নয়; এটি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি, গুণগত মান এবং তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শুধু ফাটল ঢেকে নয়, প্রকৃত কারিগরি পরীক্ষা করে মানসম্মতভাবে কাজ শেষ করা হোক এবং প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।
বার্তা বাজার/এস এইচ






