ঢাকা   বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

বিএনপি নেতার ‘ত্রাস’: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখল, নিয়োগ বাণিজ্য ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের মহোৎসব!

Authorস্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৪:১২ পিএম

বিএনপি নেতার ‘ত্রাস’: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখল, নিয়োগ বাণিজ্য ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের মহোৎসব!

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী অঞ্চলে ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। ৬ নম্বর মাটিকাটা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এহসানুল কবির টুকু নামের ওই নেতার বিরুদ্ধে এলাকার একাধিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, অ্যাডহক কমিটির সভাপতি পদ আঁকড়ে থাকা, নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি জমি দখল এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতসহ নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

​অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ই আগস্টের পর ঢাকা থেকে এসে এলাকার “জেনারেল শরীফ” ও দলীয় পদের প্রভাব খাটিয়ে একাই অন্তত পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ দখল করেছেন তিনি ও তার পরিবার।

​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এহসানুল কবির টুকু প্রেমতলী ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হলেও তার থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভাটোপাড়া বালিকা বিদ্যালয়-এর অ্যাডহক কমিটির সভাপতি পদ দখল করে আছেন। বিধি অনুযায়ী দ্রুত নিয়মিত কমিটি গঠনের নির্দেশ থাকলেও ৫ই আগস্ট ২০২৪ থেকে অদ্যাবধি তিনি অ্যাডহক সভাপতি হিসেবেই বহাল রয়েছেন। একই কায়দায় প্রেমতলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এর অ্যাডহক কমিটির সভাপতি পদটিও তিনি গত বছরের আগস্ট থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, যেখানে নিয়ম ভেঙে নিয়মিত কমিটি গঠন প্রক্রিয়াকরণ আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।

​টুকু সাহেবের পিতা মৃত জসিম উদ্দিনের নামে প্রতিষ্ঠিত প্রেমতলী জসীমউদ্দীন দাখিল মাদ্রাসা যেন এখন এক পারিবারিক আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তিন ভাই-ই স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করলেও বড় ভাই শিক্ষানুরাগী, মেজো ভাই (যিনি পেশায় চিকিৎসক) সভাপতি এবং টুকু নিজে বিদ্যুৎসাহী সদস্য সেজে পুরো মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি মাদ্রাসার গভর্নিং বডিতে একজন বিশিষ্ট ও শিক্ষিত প্রফেসর থাকা সত্ত্বেও তাকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে তোয়াক্কা না করে, টুকু সাহেবের একক ইচ্ছায় দুটি ক্ল্যারিক্যাল (করণিক) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রায় ২৬ লক্ষ টাকার বিপুল অঙ্কের ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ হয়েছে বলে এলাকায় জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।

​সবচেয়ে বড় অনিয়মের চিত্র মিলেছে প্রেমতলী সুখ বাসিয়া উচ্চ বিদ্যালয়-এ। ৫ই আগস্টের পর থেকে এই বিদ্যালয়েরও সভাপতির চেয়ারে বসেন এহসানুল কবির টুকু। এলাকার সবচেয়ে বেশি কৃষিজমির মালিকানা রয়েছে এই স্কুলের। কিন্তু বছরের পর বছর এই বিপুল পরিমাণ জমির আয়ের কোনো সুষ্ঠু হিসেব মেলেনি। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই বিদ্যালয়ের একজন নিয়মিত শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ায় অবস্থান করছেন। কিন্তু সভাপতি ও প্রশাসনের যোগসাজশে প্রতি মাসে তার নামে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা (MPO) উত্তোলন করা হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি অত্র বিদ্যালয়ে আসা প্রায় ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকার একটি বিশেষ ফান্ডেরও কোনো হদিস নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।

​অভিযোগের তীর রয়েছে প্রেমতলী ডিগ্রী মহাবিদ্যালয়-এর দিকেও, যেখানে টুকু সাহেব বর্তমান সভাপতির দায়িত্বে আছেন। পটপরিবর্তনের পর কলেজের প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপালকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে জোরপূর্বক কলেজ থেকে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত রাখা হয়। এখন শোনা যাচ্ছে, মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে ওই একই শিক্ষকদের পুনরায় কলেজে পুনর্বাসন বা ফিরিয়ে আনার গোপন চেষ্টা চালাচ্ছেন বর্তমান সভাপতি। তবে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোজাহারুল ইসলাম বলেন এসব নিউজ করা যাবে না। সামনাসামনি আসলে অনেক কথা বলা যাবে কিন্তু মোবাইলে কথা বলা ঠিক হবে না।

​শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও টুকু সাহেবের থাবা বিস্তৃত হয়েছে স্থানীয় বালুমহালে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জায়গায় গড়ে ওঠা এই বালুমহালের লভ্যাংশের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রতিবছর স্থানীয় মসজিদে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। মসজিদের সেই জমানো প্রায় ১ লক্ষ টাকা বর্তমানে টুকু সাহেবের কাছে থাকলেও তা দিতে তিনি নানা তালবাহানা করছেন বলে মুসল্লিদের অভিযোগ। ​শুধু তাই নয়, স্থানীয় জনগণের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও তার লেলিয়ে দেওয়া বাহিনীর মাধ্যমে জোরপূর্বক তীরবর্তী অঞ্চল থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

এদিকে, অত্র অঞ্চলের ‘কালিদিঘি’ নামক স্থানের রিসিভারের প্রায় ৭২ বিঘা সম্পত্তি গত টার্মে টুকু সাহেব বেনামে মাত্র ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকায় ভোগ করেছিলেন। এবার সেই সম্পত্তি জামায়াতপন্থী দাবিদার এক ব্যক্তি ডাকের মাধ্যমে ২ লক্ষ ১০ হাজার টাকায় বরাদ্দ পাওয়ায় ক্ষিপ্ত হন টুকু। তিনি তার অনুসারী নিয়ে এলাকায় ‘মব’ (উত্তেজিত জনতা) সৃষ্টি করেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উস্কানি দেন। এমনকি ওই জমিতে যাতে চাষাবাদ না হতে পারে, সেজন্য স্থানীয় গভীর নলকূপ (ডিপ) অপারেটরকে কৃষকদের পানি না দিতে সরাসরি হুমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। ডিপ অপারেটর মিজানুর রহমান বলেন, সকল কাগজপত্রসহ ডিপ বরাদ্দ আমার নামে তা জোর পূর্বক দখল করে নিয়েছেন টুকু।

​এমনকি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থস্থান ‘গৌরাঙ্গ বাড়ি’-র সম্পত্তি নিয়েও টুকু সাহেব নয়ছয় এবং দখলের চেষ্টা করছেন বলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, এহসানুল কবির টুকুর পিতা মৃত জসিম উদ্দিন স্বাধীনতার পর প্রেমতলীতে এসে মানুষের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ঢাকায় ফরেন পোস্ট অফিসে প্যাকারের চাকরি করাকালীন বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ-সম্পত্তির মালিক হন এবং ঢাকা ও প্রেমতলীতে শত শত বিঘা জমি কেনেন। বর্তমানে প্রেমতলীতে তাদের নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই। ঢাকা থেকে এলাকায় এলে তারা সাবেক মুসলিম লীগ সংসদ সদস্য মরহুম সিরাজুল ইসলামের (টুকুর মামা) ছেলেদের বাড়িতে অবস্থান করেন। ভোটার এলাকার হওয়ায় মূলত ৫ই আগস্টের পর ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুরো অঞ্চলে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি।

স্থানীয় সচেতন মহল এবং ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ এই সমস্ত অনিয়ম, দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একক ব্যক্তির কবল থেকে মুক্ত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে এহসানুল কবির টুকুকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নম্বরে ফোন দেওয়া হয়। ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 

বার্তা বাজার/এস এইচ

 

 

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন