ইটের রাস্তা পাকাকরণ কাজের ভুয়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন, এলাকাবাসীকে খুরমা জিলাপি খাইয়ে মিষ্টিমুখ করানো এবং সেই সুযোগে পুরো সাড়ে ৩ কিলোমিটার রাস্তার সরকারি ইট চুরি করে নিয়ে যাওয়ার এক নজিরবিহীন ও অভিনব প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে জামালপুরে। জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করলে টনক নড়ে প্রশাসনের।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, রাস্তা উদ্বোধনে নেওয়া হয় জামালপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুনকে। দলীয় নেতাকর্মী আর এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে তিনিই উদ্বোধন করেন রাস্তার কাজের। সাজানো এই আয়োজনটি ছিল আসলে রাস্তার ইট চুরি করে নিয়ে যাওয়ার। এলাকাবাসী বলেছেন, রাস্তার ইট তুলে নেওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তারা। অথচ এলজিইডি জানিয়েছে, এই সড়কের উন্নয়নে কোনো দরপত্রই আহ্বান করা হয়নি।
জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কটি পাকাকরণের জন্য গত ১২ মে ময়নার মোড় এলাকায় উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজটি করবেন আবদুল মান্নান। পরদিন থেকেই মান্নানের লোকজন সড়কের পুরোনো ইট তুলে বিভিন্ন গাড়িতে করে অন্যত্র সরিয়ে নেন। কিন্তু সড়কের কাজ শুরু না হওয়ায় এলাকাবাসীর সন্দেহ হয়। পরে তারা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন।
সড়কের উদ্বোধনের নামে আয়োজনটি ছিল সাজানো, উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো রাস্তার ইট চুরি করে নিয়ে যাওয়া। একই কায়দায় আরেকটি সড়কের ইট চুরির চেষ্টার সময় গত ১৬ জুন ওই চক্রের ১১ সদস্যকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিনব এই চুরি নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকে লেখালেখি করায় বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে।
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, সংসদ সদস্যসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সড়কের কাজের উদ্বোধন করায় ইট তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তারা কিছু বুঝতে পারেননি। সড়কের ইট চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পর পথটি এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
ইট চুরি চক্রের মূল হোতা আবদুল মান্নান (৫০)। তিনি সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামের আমেছ আলীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন। ওই ঘটনার কয়েক দিন আগে এলাকায় ফিরে ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দেন।
রশিদপুর ইউনিয়নের জামিল হাসান তাপস বলেন, ‘আমরাও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। এ রকম একটা প্রতারণার শিকার হবো কল্পনাও করতে পারিনি। সরকারি প্রকল্পের কাজ ভেবেই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। পরে প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি করেছি।’
জামালপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন, ‘ইট চুরির যে ঘটনা ঘটেছে সে পূর্বের বরাদ্দ ছিল। বর্তমানে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে অবগত হয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামতের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করবো। যার মাধ্যমে জনসাধারণের দুর্ভোগ লাঘব হবে।’
জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজনীন আখতার বলেছেন, ‘রাস্তার ইট চুরির করার বিষয়টি জানার পরে অভিযুক্তদের আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। চুরি যাওয়া ইটগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা দ্রুত পুনর্সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।’
প্রাথমিক হিসাবে, দুটি সড়ক থেকে অন্তত ২৬ লাখ টাকার বেশি ইট বিক্রি করেছে প্রতারক চক্র। এখন স্থানীয়দের দাবি, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি দ্রুত সড়ক দুটি পুনর্নির্মাণ করা হোক। এলাকাবাসী বলেছেন, রাস্তার ইট চুরি হওয়ার কারণে দুই ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষের চলাচলে তীব্র দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।






