ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠা শাহীনা নাছরিনকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ নিয়ে আদালতে মামলাও চলমান রয়েছে।
গত ২৫ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে শাহীনা নাছরিনকে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়। তিনি ৩৪তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। সহকারী কমিশনার (ভূমি) থেকে পদোন্নতি পেয়ে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। এর আগে তিনি খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
নাসিরনগরে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে উপজেলা মডেল মসজিদে নিয়োগ, সরকারি লবণ বিতরণ, জলমহাল ও পশুর হাট ইজারা, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
মডেল মসজিদে নিয়োগ নিয়ে মামলা
নাসিরনগর উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে খতিব, ইমামসহ কয়েকটি পদে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে চাকরিপ্রার্থী গোলাম মোস্তফা ২০২৫ সালের ৩ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। মামলায় ইউএনও শাহীনা নাছরিন, জেলা প্রশাসকসহ চারজনকে বিবাদী করা হয়।
বাদী গোলাম মোস্তফার অভিযোগ, ইমাম নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় তিনি ৫১ নম্বর পেলেও মৌখিক পরীক্ষায় কোনো নম্বর দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে নির্বাচিত প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় ৩৩ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ১৮ দশমিক ৫ নম্বর পেয়ে মোট ৫১ দশমিক ৫ নম্বরে নির্বাচিত হন। তার দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং এতে ইউএনওর প্রত্যক্ষ মদদ ছিল।
তবে শাহীনা নাছরিন বলেন, ইমাম নিয়োগের বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
পাবলিক লাইব্রেরির কর্মীকে অব্যাহতির অভিযোগ
নাসিরনগর উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরিতে দীর্ঘদিন কর্মরত এক কর্মচারীকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা এবং পরে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে ইউএনওর বিরুদ্ধে।
লাইব্রেরির সাবেক কর্মী পরিমল দাস বলেন, তিনি প্রায় ৩৮ বছর উপজেলা প্রশাসনের অধীনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কোনো কারণ না দেখিয়ে তাকে অব্যাহতি নিতে বলা হয়। পরে তার স্থলে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই অন্য একজনকে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সরকারি লবণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ
২০২৫ সালের ঈদুল আজহা উপলক্ষে নাসিরনগর উপজেলার বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসায় বিতরণের জন্য ২৪০ বস্তা সরকারি লবণ বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই লবণ বিতরণে অনিয়ম ও আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী লবণ বাজারে বিক্রির সময় স্থানীয়দের হাতে আটক হন। পরে এ ঘটনায় চুক্তিভিত্তিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী রকিবুল হাসানকে দায়ী করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
রকিবুল হাসানের দাবি, প্রকৃত অভিযুক্তদের আড়াল করতে তাকে দায়ী করা হয়েছে। তার ভাষ্য, লবণসহ কয়েকজন আটক হওয়ার সময় তিনি ইউএনওর বাসভবনে ছিলেন। পরে তাকে বিষয়টি নিয়ে কথা না বলার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ ও পুরোনো যন্ত্রাংশ বিক্রির অভিযোগও ওঠে বলে তিনি দাবি করেন।
খাস পুকুর ও জলমহাল ইজারায় অনিয়মের অভিযোগ
নাসিরনগরের বুড়িশ্বর ইউনিয়নের দক্ষিণ সিংহগ্রাম মৌজার ০.২৯ একর আয়তনের একটি খাস পুকুর ১৪৩২ থেকে ১৪৩৪ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত তিন বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি অকার্যকর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার করে পুকুরটি ইজারা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বুড়িশ্বর গ্রামের ৮২৮৭ দাগের ১ দশমিক ১৫ একর আয়তনের খাস পুকুর ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, পুকুর ইজারার ফলে পুকুরপাড়ের অন্তত ১০টি পরিবার চলাচলের রাস্তা হারিয়েছে। এ বিষয়ে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে মনোহরপুর এলাকার বিল কুপা ফিসারিকে ৭ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে মনোহরপুর অগ্রগামী যুব মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ছয় বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়।
এ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্রকে ইজারা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন মনোহরপুর প্রগতি যুব মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সম্পাদক বিশাম্ভর দাস। তার দাবি, তাদের আবেদনের পরও নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য একটি সমিতিকে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
পশুর হাট ইজারাতেও অভিযোগ
২০২৫ সালের ২২ মে নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আটটি অস্থায়ী গবাদিপশুর হাট ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, শিডিউল কেনার পরও অনেক ইজারা প্রত্যাশীকে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
গোকর্ণ ইউনিয়নের ব্রাহ্মণশাসন গ্রামের অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য ৩০ জন শিডিউল কিনলেও চারজনকে দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ৩৬ হাজার টাকা প্রাথমিক দর নির্ধারণ করা হলেও ৪৬ হাজার টাকা দর দেখিয়ে জিলু রহমানকে ইজারা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
নাসিরনগর সদরের অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য ৬০ জন শিডিউল কিনলেও পাঁচজনকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ৫০ হাজার টাকা প্রাথমিক দর থেকে ৫৩ হাজার টাকা দর দেখিয়ে তৎকালীন উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নানকে ইজারা দেওয়া হয়।
চাপরতলা ইউনিয়নের বাজারসংলগ্ন অস্থায়ী পশুর হাটের ক্ষেত্রেও ২৩ জন শিডিউল কিনলেও চারজনকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ৩১ হাজার টাকা প্রাথমিক দর থেকে ৩৪ হাজার টাকা দর দেখিয়ে নুরুল হককে ইজারা দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ইজারা প্রত্যাশীর অভিযোগ, প্রতিটি ইজারায় প্রাথমিক দরের তুলনায় সামান্য বেশি দর দেখিয়ে বাজার ইজারা দেওয়া হলেও এর পেছনে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, নির্ধারিত স্থানের পরিবর্তে কোথাও কোথাও অন্যত্র পশুর হাট বসানো হয়েছে। নাসিরনগর সদরের বালুর মাঠে অস্থায়ী বাজারের ইজারা দেওয়া হলেও সেটি নাসিরনগর সরকারি কলেজের মূল ক্যাম্পাসে বসানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থায়ী গরুর বাজার নিয়েও অভিযোগ
ফান্দাউক ইউনিয়নের স্থায়ী গরুর বাজারের ইজারা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ইউপি সদস্য আলমগীর শাহ।
তার দাবি, তারা ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা দর দিয়ে ইজারার জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ইউএনওর সঙ্গে কথা বলতে গেলে প্রতিযোগীদের সঙ্গে সমঝোতার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকায় প্রতিযোগী পক্ষকে বাজারটি ইজারা দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
উন্নয়নকাজে অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ
চাতলপাড় ইউনিয়নের ফকিরদিয়া চক বাজারসংলগ্ন সড়ক নির্মাণেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সড়ক নির্মাণের জন্য ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার নামমাত্র কাজ করে পুরো বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ফকিরদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ইমরানুল হক মামুন বলেন, দীর্ঘদিনের দাবির পর সড়কটি নির্মাণের জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেলেও ঠিকাদার অল্প কিছু কাজ করে তা বন্ধ করে দেন। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
আরও যেসব অভিযোগ
শাহীনা নাছরিনের বিরুদ্ধে সরকারি ডোবা ভরাটে সহযোগিতা, ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়ম, সরকারি বাসভবনের সামনের পুকুর সংস্কারের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম, কোটেশনের কাজ নিয়ে আর্থিক বাণিজ্য এবং কৃষিজমি ভরাট ও পলিমাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া গোকর্ণ ইউনিয়নের তানভীর হাসানের অভিযোগ, নির্বাচিত ব্যক্তি অনলাইন ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অনিয়ম আরও কয়েকটি ইউনিয়নেও হয়েছে বলে তার দাবি।
অভিযোগ অস্বীকার ইউএনওর
সব অভিযোগ অস্বীকার করে শাহীনা নাছরিন বলেন, ইমাম নিয়োগের বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। গরুর বাজারের ইজারার সময় কিছু বিশৃঙ্খলা হয়েছিল, তবে তিনি কঠোরভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সুপারিশ ছিল স্বীকার করে তিনি বলেন, এতে কোনো অনিয়ম হয়নি। অন্যান্য অভিযোগও সত্য নয় এবং সবকিছু নিয়ম মেনেই করা হয়েছে।
‘মামলা চলমান প্রক্রিয়া’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। শাহীনা নাছরিনের বদলি হয়ে গেছে। মামলা একটি চলমান প্রক্রিয়া, বিষয়টি আদালত দেখবে। মামলার সঙ্গে বদলির কোনো সম্পর্ক নেই।






