বাংলাদেশে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি বা শহীদের মৃত্যুর পর জানাজায় মানুষের ঢল নামা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই আবেগে ভাটা পড়াই স্বাভাবিক নিয়ম। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর জীবিকার কঠিন সংগ্রামে সাধারণ মানুষ সাধারণত শোক ভুলে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু শরীফ ওসমান হাদির ক্ষেত্রে ঘটছে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। তার নিহত হওয়ার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও তাকে ঘিরে আবেগ ও আলোচনা কমার বদলে আরও তীব্র হচ্ছে। বিশ্লেষকরা একে আখ্যায়িত করছেন ‘হাদি ইফেক্ট’ হিসেবে। আলজাজিরায় প্রকাশিত ফয়সাল মাহমুদের এক বিশ্লেষণের ছায়া অবলম্বনে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
আবু সাঈদ ও হাদির মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ। পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে তার বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর দৃশ্য আজ ইতিহাসের অংশ। আবু সাঈদের আত্মত্যাগ স্বৈরাচারী সরকারের পতন ত্বরান্বিত করেছিল এবং একটি ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে সেই অধ্যায়ের একরঙা সমাপ্তি ঘটেছে। ফলে তার প্রতি শ্রদ্ধা অটুট থাকলেও, সেই শোক এখন অনেকটা স্মৃতিতে পর্যবসিত।
অন্যদিকে, শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু কোনো বিজয়ের সমাপ্তি নয়, বরং এটি যেন এক অমিমাংসিত অধ্যায়ের সূচনা। তার মৃত্যু এমন এক সময়ে হয়েছে যখন মানুষ নতুন করে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তাই হাদিকে ঘিরে সৃষ্ট শোক কেবল কান্না নয়, বরং এটি এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
কেন হাদি সাধারণ মানুষের ‘আইকন’ হলেন?
শরীফ ওসমান হাদির জনপ্রিয়তার মূল চাবিকাঠি ছিল তার ভাষা। তিনি তথাকথিত সুশীল সমাজের মার্জিত ও দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলতেন না। তার বাচনভঙ্গি ছিল সোজাসাপ্টা, ধারালো এবং গ্রামবাংলার মাটির কাছাকাছি।
মাদ্রাসার ধর্মীয় শিক্ষা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত চিন্তার আবহ—এই দুইয়ের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ছিলেন হাদি। তিনি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় সাধারণ মানুষ তাকে নিজেদের একজন মনে করত। তার ধর্মীয় পরিচিতি এবং সেক্যুলার আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান তাকে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরে পরিণত করেছিল।
সংস্কৃতির লড়াই ও হাদির প্রভাব
গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে একপাক্ষিক বয়ান তৈরি করেছিল, হাদি ছিলেন তার কট্টর সমালোচক। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে মুক্তি মেলেনি।
শেখ মুজিবুর রহমানকে অতিমানবীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং ভিন্নমতকে কোণঠাসা করার যে সংস্কৃতি চালু ছিল, তার বিরুদ্ধে হাদি ছিলেন সোচ্চার। মধ্যপন্থী এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিশাল যে জনগোষ্ঠী এতদিন নিজেদের অবহেলিত মনে করত, তারা হাদির বক্তব্যের মধ্যে নিজেদের মনের কথা খুঁজে পেয়েছিল। তার মৃত্যু সেই চাপা ক্ষোভকে আগ্নেয়গিরির মতো উসকে দিয়েছে।
মৃত্যুর পরেও কেন তিনি প্রাসঙ্গিক?
হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অনেকেই এখন রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন। তার ছবি ও নাম ব্যবহার করে কেউ কেউ নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছেন। কিন্তু এসব সুযোগসন্ধানীদের ভিড়েও হাদির মূল আদর্শ ফিকে হয়ে যায়নি।
‘হাদি ইফেক্ট’ প্রমাণ করে যে, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীনতার যে ডাক তিনি দিয়ে গেছেন, তা এখনো শেষ হয়নি। জনগণ হয়তো কিছুদিন পর কান্না থামিয়ে দেবে, কিন্তু হাদি যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছেন, তার উত্তর না মেলা পর্যন্ত তিনি প্রাসঙ্গিক হয়েই থাকবেন।
শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত। তার নাম এখন আর শুধু শোকের প্রতীক নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের নাম।
(মূল লেখক:: ফয়সাল মাহমুদ, প্রেস মিনিস্টার, বাংলাদেশ হাইকমিশন, দিল্লি; আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে অনূদিত ও সংকলিত)
[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। রেডিও বার্তার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, রেডিও বার্তা কর্তৃপক্ষের নয়। ]






