বাংলাদেশের ক্রিকেট বেসামাল অবস্থায় পড়ে আছে। ২০ মাসে ক্রিকেট বোর্ডে চার সভাপতির দেখা মিলেছে; যা বিশ্বে নজিরও বলা যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ও অধিকাংশ পরিচালক দেশ ছাড়লে ক্রিকেট পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পলাতক অবস্থায় পাপন ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। তাঁর জায়গায় নতুন সভাপতি হন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদ। কয়েক মাস দায়িত্ব পালনের পর ফারুককে সরিয়ে আরেক সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে বিসিবির সভাপতি করা হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর বুলবুল মিডিয়াকে বলেছিলেন, তিনি টেস্ট নয় টি-২০ খেলতে এসেছেন। অর্থাৎ দীর্ঘদিন তিনি সভাপতির দায়িত্বে থাকবেন না। বোর্ড গুছিয়ে চলে যাবেন।
অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরিয়ান বুলবুল মুখে এ কথা বললেও চেয়ারের মায়া ত্যাগ করেননি। অবশ্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটাই হয়ে থাকে। চেয়ারে একবার বসে গেলে দায়িত্ব ছাড়তে চান না কেউ। দেখা গেল বুলবুল বিসিবির নির্বাচনে অংশ নিলেন এবং পাকাপোক্তভাবে সভাপতির আসনে বসলেন। নির্বাচন ঘিরে আবার অভিযোগেরও শেষ ছিল না। তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁর পছন্দের লোক নিয়েই নাকি নির্বাচিত কমিটি গঠন করেন। এমনকি অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। সচেতন ক্রীড়ামোদীরা এমন বোর্ড গঠনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। চারদিকে ছিল শুধু সমালোচনা আর সমালোচনা। বিএনপি সরকার গঠনের পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। তিনি অবশ্য বিসিবির সাজানো নির্বাচন ঘিরে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিলেন মন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর এ নিয়ে আমিনুল আর কোনো কথা বলেননি। বিসিবির নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তার আগে থেকে নির্বাচিত বোর্ডের পরিচালকরা পদত্যাগ শুরু করলে অনিয়মের সন্দেহটা আরও জোরালো হয়। তদন্তেও বেরিয়ে আসে তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টার স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম।
তদন্তে ভয়াবহ অনিয়ম মেলাতেই বোর্ড ভাঙা হয়েছে। আর তিন মাসের জন্য অ্যাডহক কমিটি গঠন হয়েছে। নির্বাচিত কমিটি বিলুপ্ত করা চাট্টিখানি কথা নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা আইসিসির গাইডলাইন মেনেই নির্বাচন হয়। এখানে কোনো দেশের সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আইসিসিকে নিশ্চয়ই দেখানো হয়েছে বিসিবির নির্বাচনে কী কী অনিয়ম হয়েছে। তারা এ তদন্তে সন্তুষ্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখেই বোর্ড ভেঙে দেওয়ার সম্মতি দিয়েছে। তা না হলে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যেত। ২০০১ সালে বাফুফের নির্বাচিত কমিটি ভাঙাতে বাংলাদেশের ফুটবলে কী ঘটেছিল তা সবারই জানা। তাই ক্রিকেটের নির্বাচিত কমিটি ভাঙা নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন ওঠার সুযোগ নেই।
জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির কাজ হবে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দেওয়া। যাক, এ অ্যাডহক কমিটি গড়া নিয়েও কম বিতর্ক হচ্ছে না। তামিম ছাড়া বোর্ডে এসেছেন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও আতহার আলী খানের মতো সাবেক বরেণ্য দুই ক্রিকেটার। কিন্তু সরকারি দলের মন্ত্রীর ছেলে, স্ত্রী ও সংসদ সদস্যের পুত্ররা এ কমিটিতে ঠাঁই পাওয়ায় সংসদ অধিবেশনেও সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল তর্কবিতর্ক হয়েছে। যে কারণে অনেকে বলছেন সভাপতি তামিমের কাজ করাটা কঠিন হবে।
তামিমও চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত রয়েছেন। ইতোমধ্যে তাঁর কিছু কাজ প্রশংসিতও হচ্ছে। ঘরোয়া ক্রিকেটের মর্যাদাকর আসর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ তো অচলাবস্থায় বন্দি ছিল। অধিকাংশ ক্লাবই বুলবুলের কমিটির অধীনে লিগ খেলতে চাচ্ছিল না। তামিম দায়িত্ব নিয়েই তার সমাধান করেছেন। আগামী মাসেই লিগ মাঠে গড়াবে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা ৯৫ জন ক্রিকেটারের বেতন বাড়িয়েছেন। প্রিমিয়ার লিগের অংশগ্রহণের অর্থও বৃদ্ধি করেছেন। ১২টি ক্লাব পাবে ২৫ লাখ টাকা করে। নারী ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি বাড়ানো হয়েছে।
তামিম বলেছেন, ‘অতীতে বোর্ডে কী ঘটেছে তা নিয়ে ভাবতে চাই না। আমি চাই দেশের ক্রিকেটের উন্নয়ন। কাজটি কঠিন, তার পরও সবার সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। ক্রিকেটের সবকিছু কমিটিই করবে এমন ভাবাটা ভুল হবে। পরামর্শ নিতে চাই। এখানে গুরুত্ব দেওয়া হবে পুরুষ ও মহিলা জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়কদের। তাঁরা মেধাবী ছিলেন তাই দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁদের পরামর্শ বা নির্দেশনা কাজে লাগাতে চাই। এ ছাড়া যে-কেউ আমাদের পরামর্শ দিতে পারেন। ক্রিকেট কোনো কমিটির নয়, এটা দেশের জনগণের। এখানে সবারই মতামত গুরুত্বসহকারে দেখা হবে। আমরা শুধু সেবক হয়ে এসেছি।’
জানা গেছে, সাবেক অধিনায়কদের সঙ্গে ইতোমধ্যে তামিম নিজে টেলিফোনে কথা বলে পরামর্শ দেওয়ার বৈঠক ঠিক করেছেন। আকরাম খান ও খালেদ মাসুদ পাইলট সে কথা স্বীকারও করেছেন। ১৫ বা ১৬ এপ্রিল তামিম ইকবাল সাবেক অধিনায়কদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বসতে পারেন।






