‘ভেটেরিনারিয়ানরা নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনের অভিভাবক’ এই ধারণাটি আজকের বিশ্বে ক্রমেই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রতি বছর এপ্রিল মাসের শেষ শনিবার বিশ্ব ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন “বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবস” পালন করে থাকে। যেখানে একটি নির্দিষ্ট থিমের মাধ্যমে ভেটেরিনারি পেশার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
“ভেটেরিনারিয়ানরা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের অভিভাবক” এই থিমটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক কারণ বিশ্বব্যাপী মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে প্রাণিসম্পদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাণিজ খাদ্য যেমন মাংস, দুধ, ডিম, মাছ ইত্যাদি মানুষের পুষ্টির একটি অপরিহার্য উৎস। কিন্তু এই খাদ্যগুলো নিরাপদ না হলে তা মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এখানেই ভেটেরিনারিয়ানদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু পশুর চিকিৎসাই করেন না, বরং প্রাণিজ খাদ্যের প্রতিটি ধাপে উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ এবং বিপণন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেন।
বাংলাদেশে ভেটেরিনারিয়ানদের ভূমিকা বহুমাত্রিক। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকাংশে কৃষি ও প্রাণিসম্পদের উপর নির্ভরশীল। গরু, ছাগল, মুরগি, হাঁস ইত্যাদি পালন করে লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। এই প্রাণিগুলোর সুস্থতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভেটেরিনারিয়ানরা একদিকে যেমন কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, অন্যদিকে মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য সরবরাহেও অবদান রাখেন। অসুস্থ প্রাণি থেকে উৎপন্ন খাদ্য মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে, যেমন জুনোটিক রোগ (যা প্রাণি থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়)। ভেটেরিনারিয়ানরা এসব রোগ প্রতিরোধে টিকাদান, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা প্রদান করেন। বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও ভেটেরিনারিয়ানদের অবদান অপরিসীম।
উন্নত দেশগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ করা হলেও, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, যেখানে খাদ্য দূষণের ঝুঁকি বেশি। ভেটেরিনারিয়ানরা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে কাজ করেন। তারা HACCP (Hazard Analysis and Critical Control Points) এবং অন্যান্য নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণ করে খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করেন। এছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার একটি বড় সমস্যা, যা মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করছে।
ভেটেরিনারিয়ানরা সঠিক মাত্রায় ও সঠিক সময়ে ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেন, যা এই সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। তারা খামারিদের প্রশিক্ষণ দেন, যাতে তারা স্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে প্রাণি পালন করতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার থেকে বিরত থাকে। বাংলাদেশে ভেটেরিনারি সেবার উন্নয়নে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে দেশের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার সময়ে গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বনির্ভরতা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, যা প্রাণিসম্পদ খাতকেও এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি খামারভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করেন এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাণি পালনকে একটি লাভজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রাখেন।
অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেও প্রাণিসম্পদ খাতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তার শাসনামলে ভেটেরিনারি সেবার সম্প্রসারণ, খামারিদের প্রশিক্ষণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ খাতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করেন এবং এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেন।
বর্তমান বিশ্বে “ওয়ান হেলথ”(One Health) ধারণাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণির স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়। ভেটেরিনারিয়ানরা এই ধারণার কেন্দ্রে অবস্থান করেন। তারা মানুষের এবং প্রাণির মধ্যে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধে কাজ করেন, যা বৈশ্বিক মহামারী প্রতিরোধেও সহায়ক। বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে ভেটেরিনারিয়ানদের আরও শক্তিশালী ভূমিকা প্রয়োজন। এজন্য তাদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার, যাতে মানুষ নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব বোঝে এবং স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে উৎপাদিত খাদ্য গ্রহণ করে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১০০০ জন ভেটেরিনারিয়ান স্নাতক হলেও মাঠপর্যায়ে সেবা অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ উপজেলায় মাত্র ১ জন ভেটেরিনারি সার্জন (VS) থাকার ফলে প্রাণিস্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত, জুনোটিক রোগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন ঝুঁকিপূর্ণ এবং কৃষকের আর্থিক ক্ষতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় এবারের থিমটি শুধু প্রতীকী নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের জন্য একটি কৌশলগত আহ্বান।
বাংলাদেশে ভেটেরিনারি সেবা উন্নয়নের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিচে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
১ মানবসম্পদ বৃদ্ধি ও পুনর্বিন্যাস: প্রতি উপজেলায় ন্যূনতম ৩–৫ জন ভেটেরিনারিয়ান নিয়োগ নিশ্চিত করা, ইউনিয়ন পর্যায়ে স্যাটেলাইট ভেট ক্লিনিক চালু
২. মোবাইল ও ডিজিটাল ভেটেরিনারি সেবা: মোবাইল ভেট ক্লিনিক চালু করা, টেলি-ভেট প্ল্যাটফর্ম অ্যাপ বা হটলাইন চালু করে সার্বক্ষণিক পরামর্শ প্রদান এবং এআই ভিত্তিক ‘ ডিজিজ সার্ভিলেন্স সিস্টেম’ গড়ে তোলা
৩. রোগ নিয়ন্ত্রণ ও ওয়ান হেলথ বাস্তবায়ন: মানব-প্রাণী-পরিবেশ সমন্বয় নিশ্চিত, FMD, LSD, PPR, H5N1, H9N2, Anthrax, Mastitis, ND, IBD, DP, Brucella, FC, IBH ইত্যাদি রোগের জন্য জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা, জুনোটিক রোগ মনিটরিং সেল প্রতিষ্ঠা।
৪. ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রতিটি জেলায় আধুনিক ভেট ল্যাব স্থাপন, দ্রুত রোগ নির্ণয়ের জন্য PCR ও ELISA সুবিধা সম্প্রসারণ, কোল্ড চেইন সিস্টেম উন্নত করা।
৫. শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন: ভেটেরিনারি শিক্ষায় আউটকাম বেজড শিক্ষা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন, ইন্টার্নশিপ ও আন্তর্জাতিক এক্সটার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা, গবেষণায় স্থানীয় রোগ ও ভ্যাকসিন উন্নয়নে ফোকাস করা।
৬. বাজেট ও নীতিগত অগ্রাধিকার: প্রাণিসম্পদ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেল চালু, ভেটেরিনারিয়ানদের জন্য ঝুঁকি ভাতা ও প্রণোদনা প্রদান।
৭ নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ: কসাইখানা আধুনিকীকরণ ও মাংস পরিদর্শন বাধ্যতামূলক, এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, খামার থেকে গ্রাহক পর্যায়ে (Farm to Fork) খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা।
৮. কৃষক সচেতনতা ও সম্প্রসারণ: কৃষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা, বায়োসিকিউরিটি, ভ্যাকসিনেশন ও নিউট্রিশন বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে শিক্ষা, আধুনিক সম্প্রসারণ সেবা (এসএমএস/ অ্যাপ) চালু।
ভেটেরিনারিয়ানরা শুধু প্রাণীর চিকিৎসক নন, তারা খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বাংলাদেশে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর করতে হলে মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, নীতি ও বিনিয়োগ এই চার স্তম্ভে সমন্বিত সংস্কার জরুরি। এই থিম আমাদের মনে করিয়ে দেয়: “একজন ভেটেরিনারিয়ান মানেই একটি নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা, সুস্থ সমাজ ও শক্তিশালী অর্থনীতি।” সবশেষে বলা যায়, ভেটেরিনারিয়ানরাই নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনের প্রকৃত রক্ষাকবচ। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমেই আমরা পাই নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য, নিশ্চিত হয় জনস্বাস্থ্য এবং গড়ে ওঠে একটি টেকসই ও শক্তিশালী অর্থনীতি। বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষায় তাদের অবদান অপরিসীম ও চিরস্মরণীয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
বার্তা বাজার/এস এইচ






