সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা।
শুক্রবার (৮ মে) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
‘আমাকে একজন লিখেছেন, ‘লেঞ্জা ইজ ভেরি ডিফিকাল্ট টু হাইড।’ এই লাইনটা আমার খুব পরিচিত। ২০১৩ সালে যখন শাহবাগ আন্দোলন হয়, তখন স্লোগান উঠেছিল ‘একটা একটা শিবির ধর, ধরে ধরে জবাই কর।’ আমি তখন এর প্রতিবাদ করে ফেসবুকে লিখেছিলাম যে একটা সভ্য সমাজে এমন স্লোগান গ্রহণযোগ্য নয়। এর জন্য আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ বলে যে, ‘লেঞ্জা ইজ ভেরি ডিফিকাল্ট টু হাইড’ এবং আমাকে জামাতের ছাত্রী সংস্থার প্রোডাক্ট হিসেবে চিহ্নিত করে। আমি কোথায় থাকি, কোথায় কাজ করি, সেটা খুঁজতে থাকে। বলে যে আমাকে ‘সাইজ করতে হবে’। তাদের একজন লেখেন যে, আমাকে ক্রসফায়ারে দিতে হবে।
আজকে আবার একই সুরে বলা হচ্ছে, ‘লেঞ্জা ইজ ভেরি ডিফিকাল্ট টু হাইড।’ আরও বলছেন যে, আমি শাহবাগী, বাম, ইসলামবিদ্বেষী। তবে আজকে যারা আমাকে এসব মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন, তারা ২০১৩ সালে ছিলেন নির্যাতিত। আজকে কেন এটা শুরু হলো? কারণ আমি ইমির একটি পোস্ট শেয়ার করেছি, যেখানে লিখেছেন যে জেলে তাকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলা হয়েছে, ‘ভাশুরের লাশ দেখার জন্য এত উদগ্রীব হচ্ছেন কেন?’ ইমি জেলে আটকা থাকার কারণে মাস্টার্স পরীক্ষা দিতে পারেননি। একটা বছর তার অ্যাকাডেমিক জীবন পিছিয়ে গেল। অথচ আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে ইমির জেলে থাকার কথা না। ইমি এমন ভয়ংকর কেউ নন যে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাকে জেলের শিকলে আটকে রাখতে হবে।
অভ্যুত্থানের পর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে আমরা একটি পোস্ট-আইডিওলজিক্যাল’ জায়গায় থাকব। তুমি শাপলা, আমি শাহবাগী; তুমি বাম, আমি ডান; তুমি গুপ্ত, তুমি ইসলামবিদ্বেষী – এসব ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে কদর্যতা সৃষ্টি করা হবে না। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য অনেকের মতো আমিও রাজনীতিতে যোগ দেই।
ঘোষণা দেওয়া হয় মধ্যপন্থার একটা নতুন রাজনৈতিক শক্তি গঠন করা হবে। সেখানে যেমন মওলানা আশরাফ মাহদি ভাই থাকবেন, হাসনাত থাকবেন, সারজিস থাকবেন, তেমনি ইমিও থাকবেন, সালমান মুক্তাদির থাকবেন, মানজুর আল মতিন ভাই থাকবেন। মোট কথা, সমাজের বহু মত, পথ ও পেশার মানুষকে একত্রে এনে দেশটা গড়ার কাজে সচেষ্ট হবে। বলা হয়েছিল, যাঁরা আগে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ করতেন কিন্তু নিরপরাধ, তারাও স্বাগত। আরও বলা হয়েছিল, ইতিহাসে যাঁর যে জায়গা, তাঁকে সে প্রাপ্য অনুযায়ী সম্মান দেওয়া হবে। এখন সেই জায়গা সংকুচিত হতে হতে এমন হয়েছে যে, নিজের মতের সাথে না মিললে তাঁকে নানা ধরনের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে টার্গেট করা হবে। তার আর কোনো মানবাধিকার নেই, ন্যায়বিচারের দাবি তার থাকতে পারে না। পশ্চিমা এজেন্ট, নাস্তিক – সব ধরনের মিথ্যা অপবাদ অফিসিয়ালি এখন পলিটিক্যাল টুল।
ছাত্রলীগ আমার দলে এলে সে পবিত্র। ছাত্রদল, যুবদল থেকে আমার দলে এলে সে পবিত্র। তা না হলে তারা অপবিত্র, চাঁদাবাজ। এমনিতে ডেইলি স্টার খারাপ, তবে নিজ দলের নেতারা ডেইলি স্টারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গিয়ে শুভেচ্ছা বার্তা দিলে সেটা ভালো। কেউ বিদেশি কূটনীতিকের সাথে অফিসিয়াল মিটিং করলে সে বিদেশি এজেন্ট, কিন্তু নিজ দলের নেতারা দহরম-মহরম সম্পর্ক রাখলে সেটা ঠিক আছে। এই চর্চা মধ্যপন্থা বলতে কিছু থাকতে দেবে না। হয় তুমি আমার সাথে, না হলে তুমি নাস্তিক। লিটারালি ঢাকা-৯-এ নির্বাচনের সময় আমাকে নাস্তিক, বিদেশি এজেন্ট বলে প্রচার করা হয়েছে।
যে ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করা হয়েছে, তার সবচেয়ে চেনা চেহারা ছিল এটাই। দ্বিমত মানেই দেশদ্রোহ, সমালোচনা মানেই ষড়যন্ত্র, ভিন্ন মত মানেই শত্রু। সেই একই ভাষা, একই ট্যাগ, একই ধরনের হুমকি যদি নতুন মোড়কে ফিরে আসে, তাহলে অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নষ্ট করা হবে।
মধ্যপন্থা মানে নীতিহীনতা না। মধ্যপন্থা মানে এই বিশ্বাস যে, মানুষকে তার পরিচয়ের বাক্সে আটকে না ফেলে, তার যুক্তি ও কাজ দিয়ে বিচার করতে হবে। ইমির সাথে আমার এ পর্যন্ত মোট দুই-তিনবার কথা হয়েছে (যখন সে জাতীয় নাগরিক কমিটিতে ছিলো)। সব বিষয়ে তার আর আমার মত মিলবে না, মিলতে হবেও না। যেমনটা ২০১৩ সালে শিবিরের সাথে আমার মতের মিল ছিলো না। কিন্তু একজন মানুষ অন্যায়ভাবে কারাগারে ছিলেন, এটার জবাবদিহিতা চাওয়ার অধিকার সবার আছে, এবং এটা বলার জন্য “শাহবাগী” বা “নাস্তিক” ট্যাগ দেয়া কদর্য পূর্ণ আচরণ।
সবশেষ তাসনিম জারা লেখেন, আমি ২০১৩-তেও আমার মন্তব্য থেকে পিছু হটিনি, আজও হটব না। লেঞ্জা লুকানোর কিছু নেই, কারণ লেঞ্জা কখনোই ছিল না। যা ছিল, এবং আছে, তা হলো একটা সরল বিশ্বাস : সভ্য সমাজে কাউকে জবাই করার ডাক দেওয়া যায় না, কাউকে বিনা বিচারে আটকে রাখা যায় না, এবং দ্বিমতকে দেশদ্রোহ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। এই বিশ্বাস থেকে সরে আসার কোনো কারণ আমি দেখি না।






