হাসিনার শাসনামলে ব্যাংক লুন্ঠনকারী, দুর্নীতিবাজরা জামিনে বেরিয়ে আসছেন। সেই দৃশ্য চেয়ে চেয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সকল আইনি ব্যবস্থা থাকলেও এ মুহূর্তে সংস্থাটি জরাগ্রস্ত, নির্জীব, নির্বিকার। যা নির্বাচিত সরকারের প্রতিশ্রুতির ঠিক উল্টো। সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয়েছে ‘জিরো টলারেন্স’।
অথচ কারাগারে থাকা দুর্নীতিবাজরা এক এক করে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। তাদের বেরিয়ে আসার পক্ষে ‘আইনজীবী’ হিসেবে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কাজ করছেন সরকারি দল সমর্থক কোনো কোনো আইনজীবী। একজন পক্ষঘাতগ্রস্ত মানুষ যেমন সবই দেখেন, বোঝেন, অথচ কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না-দুদকের এখনকার অবস্থাও তাই। সংস্থাটিতে কমিশন নিয়োগ না করার কারণে নির্বিঘেœ কারামুক্ত হচ্ছেন দুর্নীতিবাজরা। এমনও কিছু আছেন এরই মধ্যে দুর্নীতি মামলায় জামিন পেয়েছেন। অন্য মামলায় গ্রেফতার থাকায় কারামুক্ত হতে পারছেন না। হয়তো কারামুক্ত হবেন যেকোনো মুহূর্তে। এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে অনেক।
অর্থখাতের ‘রাখাল বালক’খ্যাত বাংলাদেশ ব্যাংকের আওয়ামী অনুগত গভর্ণর ড. আতিউর রহমান-আবুল বারকাতসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এজাহারে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, পরষ্পর যোগসাজশে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব জনতা ব্যাংকের ২শ’ ৯৭ কোটি টাকা আত্মসাতের। গত বছর ২০ ফেব্রুয়ারি মামলাটি (নং-৪৪/২০২৫) মামলাটি রুজু হয়।
জালিয়াতির মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে একের পর এক ঋণ নিয়েছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী ইউনূছ বাদলের মালিকানাধীন ‘অ্যাননটেক্স’। নির্ধারিত ঋণসীমা অতিক্রম করে বার বার তাকে পুন:তফসিলের সুযোগ করে দেন ব্যাংকটির তৎকালিন চেয়ারম্যান ও ‘বাংলাদেশে জঙ্গি অর্থায়ন’ তত্ত্বের জনক ড.আবুল বারকাত।
‘জালিয়াত মাস্টার’ ইউনূছ বাদল নামে বেনামে ২২টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন হাসিনার লুটতন্ত্রের অন্যতম এই ডাকাত। ভয়াবহ এ ঋণ জালিয়াতির অনুসন্ধান দীর্ঘদিন ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিলো হাসিনা অনুগত তৎকালিন দুদক। বহুমাত্রিক আর্থিক অপরাধের একটি হচ্ছে এই ২৯৭ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি।
অ্যাননটেক্সের বিরুদ্ধে আরো কয়েকটি ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। দুদক উপ-পরিচালক নাজমুল হোসাইন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলায় জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল বারাকাতকে ২০২৫ সালের ১০ জুলাই গ্রেফতার কর হয়। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ তার জামিন বহাল রাখায় ড. আবুল বারকাতের কারামুক্তিতে আইনি কোনো বাঁধা নেই মর্মে জানান তার আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান এবং সৈয়দ মামুন মাহবুব। ড. বারকাতের আইনজীবীরা জানান, বিচারিক আদালতে পাসপোর্ট জমা রাখার শর্তে এই জামিন বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। ফলে তারা কারামুক্তিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
এর আগে গত ২৩ এপ্রিল হাইকোর্টে স্থায়ী জামিন লাভ করেন আলোচিত সাদেক অ্যাগ্রোর মালিক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন। তার বিরুদ্ধে দুদক ১শ’ ৩৩ কোটি টাকা পাচারের মামলা করেছিলো। জামিন আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি কেএম জাহিদ সারওয়ার এবং বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের ডিভিশন বেঞ্চ তার জামিন মঞ্জুর করেন। ইমরান হোসেনের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি ও বিএনপিপন্থি আইনজীবী নেতা ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন ও ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন। সরকারপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আশিকুজ্জামান নজরুল ও সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আল-আমিন।
এর আগে দুদকের মামলায় জামিন পান হাসিনা অনুগত সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। মিথ্যা হলফনামা দিয়ে রাজউকের কাছ থেকে ১০ কাঠার প্লট গ্রহণের দায়ে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট এবিএম খায়রুল হকসহ সংশ্লিষ্ট ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। সংস্থার উপ-পরিচালক মো: মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে দ-বিধির ১৬১/১৬৩/৪০৯/৪২০/১০৯ এবং ১৯৪৭ সালের ২ নম্বর দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় এ মামলা করা হয়। এ মামলায় গত ১১ মার্চ হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এবিএম খায়রুল হকের জামিন মঞ্জুর করেন। খায়রুল হকের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান এবং অ্যাডভোকে মোতাহার হোসেন সাজু। পক্ষান্তরে সরকারপক্ষে শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দা সাজিয়া শারমিন। সরকারপক্ষ এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগ সেটি নাকচ করে দেন। সেইসঙ্গে গত ২৮ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগীয় বেঞ্চ ইতিপূর্বে হাইকোর্টে দেয়া জামিন বহাল রাখেন। প্রায় সবক’টি মামলায় জামিন মঞ্জুর হওয়ায় এবিএম খায়রুল হকের কারামুক্তি এখন সময়ের ব্যপার মাত্র।
দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় সম্প্রতি জামিন দেয়া হয় হাসিনা অনুগত সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে। ৩ কেটি ২৬ লাখ ৪৮ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চলতি বছর ১৫ জানুয়ারি দুদক এ মামলা করে। দুদকের সহকারি পরিচালক আখতারুজ্জামান মামলাটির বাদী। এ মামলার জামিনের জন্য আনিস আলমগীরকে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থও হতে হয়নি। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো: সাব্বির ফয়েজ গত ১৪ মে তাকে স্থায়ী জামিন দেন। শুধু জামিনই নয়-তাকে বিদেশ যাওয়ারও অনুমতি দেন আদালত। আনিস আলমগীরের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট তাসলিমা জাহান পপি।
দুর্নীতি মামলায় জামিনলাভের ঘটনায় লক্ষ্যনীয় একটি বিষয় হচ্ছে, কোনোটিতে দুদকের পক্ষে কোনো আইনজীবী থাকছে না। জামিনের মৃদু আপত্তি জানাচ্ছে অ্যাটর্নি অফিস কিংবা জেলা প্রশাসন। অথচ দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪’ এর ৩৩ (১) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে ‘আইনের অধীন কমিশন কর্তৃক তদন্তকৃত এবং স্পেশাল জজ কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলাসমুহ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রসিকিউটর এর সমন্বয়ে কমিশনের অধীন উহার একটি স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট থাকিবে।’
আইনে ‘নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট’ থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে দুদকের তালিকাভুক্ত কিছু আইনজীবী দিয়েই গত ২২ বছর আইনি লড়াই চালিয়ে আসছে। তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের ‘কেস টু কেস’ নিয়োগ দেয়া হয়। এই নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রদান কিংবা ওকালতনামায় স্বাক্ষর দিতে হয় খোদ কমিশনকে। কিন্তু দুই মাসেরও বেশি সময় দুদকে কোনো কমিশন না থাকায় দুর্র্নীতির মামলাগুলোতে দুদকের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনার জন্য কোনো আইনজীবী নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না। ফলে একতরফাভাবে এবং নির্বিঘেœ জামিন পাচ্ছেন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা। যদিও প্রতিটি জামিন শুনানির সময় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় নিযুক্ত সরকারি আইন কর্মকর্তা থাকছেন।
কিন্তু তাদের ভূমিকা অনেকটা স্বাক্ষী গোপালের মতো। দুদক যেহেতু স্বশাসিত স্বাধীন সংস্থা এবং দুদকের প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের নিজস্ব আইন রয়েছে, সেহেতু দুর্নীতিবাজদের জামিন লাভ প্রশ্নে সরকারি আইন কর্মকর্তাদের আইনগত কোনো দায়বদ্ধতা নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম প্রতিবেদককে বলেন, দুদক দায়েরকৃত মামলার কোনো আসামি আনকন্টেস্টে জামিন পাচ্ছেন-এমন অভিযোগ ঠিক নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রয়েছেন। তারা জামিনের বিরোধিতা করছেন। তাদের প্রতি আমাদের অনুরোধও রয়েছে।
তবে দুদক সচিবের এ দাবি আইনানুগ নয়-মর্মে মন্তব্য করেছেন সংস্থাটির সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল), অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ মো: মইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, দুদক সচিবের কথা ঠিক নয়। তার কথায় রাষ্ট্রের আইনজীবী আদালতে ‘মুভ’ করতে পারেন না। রাষ্ট্রের আইনজীবী লড়বেন অ্যাটর্নি অফিসের নির্দেশে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের আইনজীবী দিয়ে যদি দুদকের কাজ চলতো তাহলে দুদকের আলাদা প্যানেল আইনজীবী থাকার কোনো বিধান দুদক আইনে থাকতো না। এখন দুদকের যেসব মামলা চলছে সেগুলোতে কোনো কন্টেস্টই হচ্ছে না। সাবেক এই মহাপরিচালক বলেন, কোনো জামিন আদেশ কিংবা রায় দুদকের বিপক্ষে গেলে সেটির বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কি হবে না-দুদক এখন এই সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না। কারণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে কমিশন লাগবে। কমিশন নেই তিন মাস হতে চললো। কমিশন শূন্যতার কারণে দুর্নীতিবাজদের পোয়াবারো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
মঈদুল ইসলাম আরো বলেন, এতোদিন ধরে কমিশন নিয়োগ না করায় মনে হচ্ছে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করাটা পরিকল্পিত। দুদককে একটি সক্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখার সদিচ্ছা নেই বলেই মনে হচ্ছে। তারচেয়েও বড় প্রশ্ন, দুর্নীতি দমনের আদৌ কোনো ইচ্ছে এ সরকারের রয়েছে কি না!
বার্তা বাজার/এমএমএইচ






