বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী ৮০ জন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন দলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করেছেন গতকাল বুধবার। বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসাবে তারা দল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে মেনে নিয়েছেন, তাকে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দিয়েছেন বিধানসভার স্পিকারও।
গত কদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের যে জল্পনা চলছিল, কার্যত তার অবসান ঘটল বুধবার। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর মনোনীত পরিষদীয় দলের বিরুদ্ধে গিয়ে এই পদক্ষেপ তৃণমূলের ‘ফাটল’কে আরো স্পষ্ট করে দিল।
এর আগে তৃণমূলের পক্ষ থেকে দলের বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম বিরোধী দলনেতা হিসাবে প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাবনায় যে স্বাক্ষর রয়েছে সেখানে ‘অসংগতি’ রয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়েছিলেন ঋতব্রত ব্যানার্জী এবং তৃণমূলের টিকিটে জিতে আসা অপর বিধায়ক সন্দীপন সাহা।
এই তথ্য রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে আনার পর ঋতব্রত এবং সন্দীপন— দু’জনকে তড়িঘড়ি বহিষ্কার করে দল।
তৃণমূলের টিকিটে জিতে আসা ৫৮জন বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিরোধী দলনেতা হিসাবে বেছে নেওয়ার পক্ষে স্বাক্ষর করে একটা চিঠি জমা দেন বিধানসভার স্পিকারের কাছে। সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।
তৃণমুল কংগ্রেসের দুই ‘বিদ্রোহী’ নেতা: ঋতব্রত ব্যানার্জী (ডান দিকে) ও সন্দীপন সাহা (বাঁয়ে)
বুধবার সকাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় উপস্থিত হন একের পর এক তৃণমূল বিধায়ক। সাংবাদিকদের সামনে সেই সময় কেউ কোনো মন্তব্য না করলেও, নতুন পরিষদীয় দলনেতা বেছে নেওয়ার জন্যেই যে এই ‘বিদ্রোহী’ বিধায়করা বুধবার বৈঠক করবেন— এমন অনুমান করেছিলেন অনেকে।
ঋতব্রত ব্যানার্জী বিধানসভায় প্রবেশের সময়ও উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, কোনো ‘জল্পনায়’ ‘ইন্ধন’ দিতে প্রস্তুত নন তিনি। তবে সে সময় সন্দীপন সাহা জানিয়েছিলেন, তাদের কাছে “দুই তৃতীয়াংশের বেশি বিধায়কদের সমর্থন রয়েছে।”
ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই সোমবার থেকে যে জল্পনা চলছিল, তা-ই বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়। বিধানসভার স্পিকারের কাছে নতুন বিরোধী দলনেতা বেছে নেওয়ার জন্য চিঠি জমা দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে উপ দলনেতা এবং মুখ্য সচেতকের (চিফ হুইপের সমতুল্য) নামও উল্লেখ রয়েছে। এই চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলনেত্রী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে বিরোধী দলনেতা করা হয়েছে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে।
পরে তৃণমূলের ‘ঋণব্রতপন্থি’ বিধায়কদের বরাতে জানা গেছে যে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু।
এ দিন বিকেলে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা পাওয়ার পর ঋতব্রত ব্যানার্জী জানান, তৃণমূলের হয়েই তিনি এই ভূমিকা পালন করবেন। আরও জানিয়েছেন, তাদের পক্ষে থাকা বিধায়কদের সংখ্যা আরো বাড়তে চলেছে।
বিবিসি বাংলাকে ঋতব্রত বলেছেন, “যদি কিছু ঠিক না হয় তাহলে হাউজের ভিতরে এবং বাইরে বিরোধিতা করব। আবার পজিটিভ কিছু হলে শুধুমাত্র বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা করব না।”
“মমতা ব্যানার্জীকে আমাদের প্রধান পরামর্শদাতার ভূমিকায় থাকার অনুরোধ জানাব। মমতাদি থাকলে ভাল কাজ করতে পারব।”
যে সমস্ত তৃণমূল বিধায়করা বুধবার ঋতব্রত ব্যানার্জীকে পরিষদীয় দলনেতা হওয়ার প্রস্তাবনায় স্বাক্ষর করেছেন, সেই তালিকায় মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এবং সদ্য প্রাক্তন মন্ত্রী জাভেদ খানও আছেন। রয়েছেন কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা, সুজাপুরের বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন, রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামানের মতো বহু পরিচিত তৃণমূলের নেতাও।
ঋতব্রত ব্যানার্জীকে পরিষদীয় দলনেতা হিসাবে বেছে নেওয়ার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তার প্রশ্ন, দল যেখানে ইতোমধ্যে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বহিষ্কার করেছে, সেখানে তিনি কীভাবে তৃণমূলের বিরোধী দলনেতা হতে পারেন?
“যারা জিতেছেন, যারা এটা করলেন তারা কিন্তু মমতা ব্যানার্জীর আশীর্বাদে জিতেছেন, তার ছবি ব্যবহার করেই জিতেছেন। এটা ভুলে গেলেন কী করে?”
বিবিসি বাংলাকে কুনাল আরও বলেন, “এভাবে চোরাগোপ্তা পথে এসব করার কী দরকার ছিল? আমাদের দল কী করবে—তা ঠিক করা হবে। গতকাল আমরা নিয়াম মাফিক একটি চিঠি জমা দিয়েছি বিধানসভায়, তাদের মতো চোরাগোপ্তা পথে দিইনি।”
এই ঘটনায় দল কী পদক্ষেপ নেবে, আইনি পথে যাবে কি না তা শিগগিরই জানানো হবে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন কুনাল।
এদিকে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে সিংহভাগ তৃণমূল কংগ্রেস পরিষদীয় দলনেতা হিসাবে বেছে নেওয়ার পরে এক বিবৃতি দিয়ে দলটি জানিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে দলের সব স্তরের কমিটি তারা ভেঙে দিচ্ছে। শাখা সংগঠনগুলির কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
তারপর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ভুলক্রুটি বিশ্লেষণ করবে দলটি। তারপরে আবার নতুন করে কমিটি গড়া হবে।
ভোটের পরে তৃণমূলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলনেতা হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে। উপদলনেতা ছিলেন অসীমা পাত্র ও নয়না ব্যানার্জী এবং পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক (চিফ হুইপ) হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয় ফিরহাদ হাকিমকে।
বিরোধী দলনেতা বেছে নেওয়ার ওই প্রস্তাবনায় তৃণমূলের বিধায়কদের স্বাক্ষরকে ঘিরে ‘সমস্যার’ সূত্রপাত। স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগ তোলেন ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা।
এই মর্মে হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের হয়, পরে মামলার তদন্তভার সিআইডি-র হাতে তুলে দেওয়া হয়।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোমবার জানান, তদন্তের সময় দেখা গিয়েছে একাধিক স্বাক্ষর ইংরেজির ক্যাপিটাল লেটারে এবং সিআইডি-র তদন্তের সময় বেশ কয়েকজন বিধায়ক বলেছেন প্রস্তাবনায় থাকা স্বাক্ষর তাদের নয়।
এই বিষয়টি ঘিরে আলোচনা চলছিল। একইসঙ্গে চলছিল তৃণমূলের অন্দরে ‘ভাঙন’ নিয়ে আলোচনাও।
কারণ ভোটে ভরাডুবির পর তৃণমূলের একাধিক নেতা ও কর্মীরা দলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরব হয়েছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল অভিষেক ব্যানার্জী ও তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ।
স্বাক্ষর নিয়ে ‘অসংগতি’র কথা প্রকাশ্যে আসার পর ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণাকারী তৃণমূলের বিধায়কদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
মঙ্গলবার মমতা ব্যানার্জী যে ধর্নার ডাক দিয়েছিলেন সেখানে নয়না ব্যানার্জী, কুণাল ঘোষের মতো কয়েকজন বিধায়ক এবং তৃণমূল নেতাদের দেখা গেলেও অনেকেই অনুপস্থিত ছিলেন।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
বার্তা বাজার/এমএমএইচ






