ভারতের প্রধান বিচারপতি কিছুদিন আগেই দেশটির বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা দিয়েছিলেন। তাঁর সেই মন্তব্যের পর ভারতজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে, এমনকি রাতারাতি ককরোচ জনতা পার্টি–সিজেপি নামে একটি প্ল্যাটফর্মও গড়ে ওঠে। এমনকি তারা এরই মধ্যে আন্দোলনেও নেমে গেছে। এ অবস্থায় প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ভারতীয় তরুণদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
গতকাল রোববার যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, প্রযুক্তির ভূমিকা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, ভারতে আইনজগতের তরুণ প্রজন্ম অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম এবং দ্রুত প্রযুক্তি গ্রহণে সক্ষম। জেলা আদালতের বিচারিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সরকারি আইনজীবী এবং করপোরেট লিগ্যাল অ্যাডভাইজর—সব ক্ষেত্রেই এই প্রজন্ম বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, এই তরুণ মস্তিষ্কগুলোই ভারতের বিচারব্যবস্থায় চলমান সংস্কার ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের একটি বড় উৎসাহব্যঞ্জক শক্তি হয়ে উঠেছে। ‘সংবিধানের প্রতিশ্রুতি থেকে ডিজিটাল বাস্তবতায়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগে ন্যায়বিচার রক্ষা’—শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি জানান, বিচারব্যবস্থায় প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি একটি স্বদেশীয় এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার দিকেও কাজ চলছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রযুক্তিকে কখনোই মানবিক বিচারবোধের বিকল্প হিসেবে দেখে না। বরং এটি বিচারিক চিন্তাকে সহায়তা করার একটি মাধ্যম মাত্র। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘স্বদেশি জুরিসপ্রুডেন্স’ ধারণার ওপর গুরুত্ব দেন, যা ভারতের সাংবিধানিক মূল্যবোধ, প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। বিদেশি প্রযুক্তিগত মডেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, প্রযুক্তি শুধু ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করেনি, বরং বিশ্বজুড়ে বিচারব্যবস্থাগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সংলাপ তৈরি করেছে। এতে একটি আন্তসংযুক্ত বৈশ্বিক বিচারিক সম্প্রদায় গড়ে উঠছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, এটি মানবিক বিচারবোধের জায়গা নিতে পারে না। এআই বিপুল আইনি তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারে এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে, কিন্তু এটি সহানুভূতি, নৈতিক বিচারবোধ এবং প্রাসঙ্গিক বোঝাপড়ার মতো মানবিক গুণাবলি ধারণ করে না—যেগুলোই আইনকে জীবন্ত করে তোলে।
ককরোচদের আন্দোলনে বিদেশি হাত আছে, অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: বিজেপিককরোচদের আন্দোলনে বিদেশি হাত আছে, অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: বিজেপি
এর আগে, গত ১৫ মে বিচারপতি সূর্যকান্ত তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বেকার কিছু তরুণ “তেলাপোকা” হয়ে গেছেন। তাদের কেউ কেউ মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া আবার অনেক সময় আরটিআই (তথ্য অধিকার) অ্যাকটিভিস্ট বনে যান। তারপর পুরো ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ শুরু করেন।’
দিল্লি হাইকোর্টে ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ পদবি পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নির্দেশনা চেয়ে এক আইনজীবীর দায়ের করা আবেদনে ক্ষুব্ধ হয়ে এই মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি। বেদনকারী আইনজীবী নিজেও এই পদবি পেতে ইচ্ছুক ছিলেন। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চে শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচারকেরা ‘সিস্টেমের বিরুদ্ধে’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টগুলো সম্পর্কে অবগত আছেন। সমাজে বিচার বিভাগকে আক্রমণ করার জন্য এমনিতেই যথেষ্ট ‘পরজীবী’ আছে। আইনজীবীদের তাঁদের সঙ্গে হাত মেলানো উচিত নয়।
ওই আইনজীবীকে ভর্ৎসনা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সমাজে ইতিমধ্যে কিছু পরজীবী রয়েছে, যারা ব্যবস্থাকে আক্রমণ করছে, আর আপনি তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে চান? কিছু তরুণ আছেন তেলাপোকার মতো। তাঁরা কোনো চাকরি পান না, পেশাতেও তাঁদের কোনো জায়গা নেই। তাঁদের কেউ মিডিয়া হন, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া হন, কেউ আরটিআই অ্যাকটিভিস্ট হন, আবার কেউ অন্য কোনো ধরনের অ্যাকটিভিস্ট হয়ে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করেন। আর আপনারা অবমাননার পিটিশন দাখিল করেন।’
বার্তা বাজার/এস এইচ






