ঢাকা   রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

খুটাখালী-ঈদগড় সড়ক নিয়ে বন বিভাগ-এলজিইডির টানাপোড়েন, দুর্ভোগে লাখো মানুষ

Authorস্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম

খুটাখালী-ঈদগড় সড়ক নিয়ে বন বিভাগ-এলজিইডির টানাপোড়েন, দুর্ভোগে লাখো মানুষ

কক্সবাজারের চকরিয়ার খুটাখালী থেকে রামুর ঈদগড় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প শেষ মুহূর্তে এসে বন বিভাগের আপত্তিতে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এতে চকরিয়া, রামু, নাইক্ষ্যংছড়ি, লামাসহ আশপাশের পাঁচ উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের দুটি প্যাকেজে প্রায় ১৯ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। তবে বন বিভাগের আপত্তির কারণে মাঝপথের অংশে কাজ বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, জাইকার অর্থায়নে দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় খুটাখালী থেকে ঈদগড় পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। আগামী বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা। ইতোমধ্যে খুটাখালী বাজার থেকে মধুশিয়া এবং অপর প্রান্তে ঈদগড় থেকে কালাপাড়া পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়কের কাজ শেষ হয়েছে। এখন বাকি রয়েছে মধুশিয়া বনের মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশ।
এ অংশে কাজ শুরুর জন্য বন বিভাগের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চাইলে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে চিঠি দেয়। এরপর থেকেই প্রকল্পটির মাঝপথের কাজ স্থবির হয়ে পড়ে। এতে বন বিভাগ ও এলজিইডির মধ্যে বিপরীতমুখী অবস্থান তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কটি রামুর ঈদগড়, লামার ফাঁসিয়াখালী, নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ও চকরিয়ার খুটাখালীকে সংযুক্ত করেছে। কিন্তু মাঝের অংশটি অচল থাকায় মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পথ যেতে স্থানীয়দের প্রায় ২০ কিলোমিটার ঘুরতে হচ্ছে।
বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে মধুশিয়া এলাকায় দেখা যায়, যে বনাঞ্চল নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে, তার বিভিন্ন স্থানে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে। কোথাও বন বিভাগের লাল পতাকা থাকলেও বিকল্প পথ দিয়ে বালুবাহী ডাম্পার চলাচল করছে। আবার কোথাও বনভূমি কেটে চলাচলের পথ তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা জড়িত।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, বন বিভাগ যে অংশকে পাঁচ কিলোমিটার সংরক্ষিত বন বলে দাবি করছে, বাস্তবে ঘন গর্জন বন রয়েছে মাত্র ৫০০ থেকে ৭০০ মিটার এলাকায়। বাকি অংশজুড়ে রয়েছে পুরোনো সড়ক, খোলা জায়গা ও কৃষিজমি। তাদের দাবি, এটি নতুন কোনো রাস্তা নয়; ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানে জনসাধারণের চলাচল রয়েছে। বিদ্যমান সড়কের প্রস্থ ৩০ থেকে ৪০ মিটার।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, সড়কটিতে আগে থেকেই একটি সেতু ও তিনটি কালভার্ট রয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, খুটাখালীর হরইখোলা এলাকায় আরও ১৮০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, সড়কটি নির্মিত হলে কক্সবাজার ও বান্দরবানের পাঁচ উপজেলার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে, উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং দুর্গম বিকল্প সড়কে ডাকাতি ও অপহরণের ঝুঁকিও কমবে।

খুটাখালীর ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী লিটন বলেন, “এটি ব্রিটিশ আমলের রাস্তা। এলাকাবাসী স্বেচ্ছায় জমি দিয়েছেন। এখানে আগে থেকেই একটি সেতু ও তিনটি কালভার্ট রয়েছে। পাঁচ কিলোমিটার গর্জন বন থাকার দাবি সঠিক নয়। যে অংশে বন রয়েছে, সেখানেও প্রশস্ত রাস্তা আছে। ফলে একটি গাছও কাটতে হবে না।”
স্থানীয় কৃষক কামাল উদ্দিন বলেন, “সড়ক না থাকায় ১৫ কানি জমিতে ঠিকমতো চাষাবাদ করতে পারি না। রাস্তা হলে উৎপাদন বাড়বে, সময় বাঁচবে। এখন ডাকাতি ও অপহরণের ভয়েও মানুষ ওই পথে চলাচল করতে চায় না।”
লামার ফাঁসিয়াখালীর বাসিন্দা ইয়াকুব আলী বলেন, “ডুলাহাজারা বা খুটাখালী যেতে মোটরসাইকেল কিংবা হেঁটে যেতে হয়। বর্ষাকালে সেটিও সম্ভব হয় না। কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ারও উপায় থাকে না।”
একই এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “এ অঞ্চলের মানুষ কৃষি, বাগান ও খামারের ওপর নির্ভরশীল। ভালো রাস্তা না থাকায় উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না।”
স্থানীয় বাসিন্দা নুর আহমদ বলেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি। স্বাস্থ্যসেবাও নেই। অনেক শিশুকে পঞ্চম শ্রেণির পর পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হয়।”
ফাঁসিয়াখালী ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আবুল হোসেন বলেন, “এখানে প্রায় ১৭ হাজার মানুষের বসবাস। একসময় এই সড়কে জিপ চলত। সড়কটি নির্মিত হলে মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসবে।”

সড়ক নির্মাণে বন বিভাগের আপত্তির প্রতিবাদে শুক্রবার বিকেলে চকরিয়ার খুটাখালী ইউনিয়নের পূর্বপাড়া এলাকায় মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা দ্রুত সড়ক নির্মাণকাজ শুরুর দাবি জানিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহ উদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ১১ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ইতোমধ্যে উভয় প্রান্তে প্রায় সাড়ে ৮ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মাত্র ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার অংশ নিয়ে বন বিভাগ অযৌক্তিক আপত্তি তুলেছে। শতবর্ষের পুরোনো এই সড়ক নির্মাণে একটি গাছও কাটতে হবে না। বরং সড়কটি চালু হলে রামু, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি ও চকরিয়াসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ এবং কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে।

ছাত্রনেতা রায়হান উদ্দীনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন খুটাখালী ইউপি চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুর রহমান, প্যানেল চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ পেটান, সাবেক ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন, শিক্ষক মাওলানা শাহাব উদ্দিন আরমান, সাঈদ মো. শাহজালাল, যুবনেতা শীষ মোহাম্মদ রাশোল ও শ্রমিক নেতা কামাল উদ্দিন। এতে খুটাখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড, কালাপাড়া, লাইল্যারমারপাড়া, কাগজিখোলা, রইগ্যাঝিরি ও সাপেরগাড়া এলাকার শতাধিক মানুষ অংশ নেন।

এদিকে প্রকল্পটি নিয়ে বন বিভাগ ও এলজিইডির অবস্থান এখনো বিপরীতমুখী। বন বিভাগ সংরক্ষিত বন ও এশীয় হাতির চলাচল রক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অন্যদিকে এলজিইডি বলছে, বিদ্যমান সড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে এবং এতে কোনো গাছ কাটার প্রয়োজন হবে না।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মারুফ হোসেন বলেন, “এলজিইডি প্রকল্পের দুই পাশের কাজ শেষ করার পর বন বিভাগের অনাপত্তিপত্র চেয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর সড়ক নির্মাণ হলে মহাবিপন্ন এশীয় হাতির চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়তে পারে। এতে মধুশিয়ার প্রাচীন গর্জন বনও ঝুঁকির মুখে পড়বে।”

অন্যদিকে এলজিইডির কর্মকর্তারা বলছেন, এটি একটি গেজেটভুক্ত জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সড়ক। পুরো সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে চকরিয়া অংশে ১১ কিলোমিটার এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি অংশে পাঁচ কিলোমিটার। সড়কটি চালু হলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে ঈদগড়, খুটাখালী ও বাইশারী অঞ্চলের সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে। এতে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা যাবে এবং বর্ষাকালে মানুষের দুর্ভোগ কমবে।

চকরিয়া উপজেলা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী ফরিদুল আলম বলেন, “প্রকল্পের দুটি প্যাকেজে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে উভয় প্রান্তে কাজ চলছে। বন বিভাগ যে অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছে, সেখানে এখনো নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি।”
তিনি বলেন, “যেসব অংশে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, সেখানে বন বিভাগের জমি নেই; রয়েছে বাজার, বসতি ও কৃষিজমি। তাই ওই অংশে বন বিভাগের অনাপত্তিপত্রের প্রয়োজন হয়নি। সড়ক নির্মাণে প্রায় ২০ মিটার জায়গা প্রয়োজন হলেও সেখানে ৩০ থেকে ৪০ মিটার প্রশস্ত বিদ্যমান রাস্তা রয়েছে। ফলে কোনো গাছ কাটার প্রয়োজন হবে না এবং বন্যপ্রাণীর চলাচলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।”

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন