একসময় দিন-রাত ব্যস্ত থাকত বিশাল উৎপাদন ইউনিট। চিমনি দিয়ে বের হতো সাদা ধোঁয়া, ট্রাকে ট্রাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যেত কৃষকের প্রয়োজনীয় ইউরিয়া সার। আজ সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল) যেন এক নীরব শিল্পনগরী।
উৎপাদনের শব্দ নেই, নেই কর্মচাঞ্চল্য। টানা ১৬ মাস ধরে গ্যাস সংকটে বন্ধ রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার কারখানাটি।
কিন্তু উৎপাদন বন্ধ মানেই ব্যয় বন্ধ নয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ব্যাংক ঋণের সুদ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে প্রতি মাসে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদন না হলেও বাড়ছে আর্থিক ক্ষতির বোঝা।
কারখানা সূত্র জানায়, পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে প্রতিদিন ৪৭ থেকে ৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে সেই পরিমাণ গ্যাস না পাওয়ায় বারবার উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে। মাঝেমধ্যে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহ এলেও তা দিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়নি।
আশুগঞ্জ সার কারখানা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবু কাউসার বলেন, ১৯৮৩ সাল থেকে কারখানাটি বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করে আসছে। সক্ষমতা এখনও রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর যন্ত্রপাতি সচল করে উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়ার পরই আবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে উৎপাদন প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় যন্ত্রপাতি অচল থাকলে সেগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন শ্রমিকরা। তাদের ভাষ্য, শুধু যন্ত্রই নয়, দীর্ঘদিন উৎপাদনের বাইরে থাকায় দক্ষ জনবলও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে বেতন-ভাতা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
কারখানার উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও সব ধরনের পরিচালন ব্যয় বহাল রয়েছে। ফলে প্রতি মাসে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য ইউরিয়া সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে গেলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামের ওঠানামাও দেশের কৃষি খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, আশুগঞ্জ সার কারখানাকে সচল রাখা শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাঁচানোর বিষয় নয়; এটি কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। তাই দ্রুত গ্যাস সংকট নিরসন করে কারখানাটিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।






