“২৮ জুন রাত ১১টার দিকে হঠাৎ বাড়ির চারপাশে গোলাগুলি শুরু হয়। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে গুলি চলে। একপর্যায়ে বাড়ির দরজায় গুলি করা হয়, লাথিও মারা হয়। পরদিন সকালে বের হয়ে দেখি, আশপাশের প্রায় সব বাড়িতে তালা। এরপর মেয়েকে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিই।”
কথাগুলো বলছিলেন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা খালেদা বেগম। তাঁর দাবি, ওই ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তার কারণে তিনি আর নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেননি।
খালেদা বেগম একা নন। বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া-নোয়াখালী জুম্মাপাড়াসহ পাহাড়ঘেঁষা কয়েকটি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনায় শতাধিক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে না থেকে নিরাপদ স্থানে রাত কাটাচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক মাস ধরে এসব ঘটনা বেড়েছে। এর প্রতিবাদে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অপহরণবিরোধী পোস্টারও টানানো হয়েছে।
সর্বশেষ গত ১৭ জুলাই বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর নয়াপাড়া এলাকায় মহিষ আনতে গিয়ে আরাফাত (১২) নামে এক শিশু অপহরণের শিকার হয়। পরিবারের সদস্যদের দাবি, অপহরণের পর তাঁর মুক্তির জন্য ১২ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে চার লাখ টাকা দেওয়ার পর শিশুটিকে ফিরিয়ে আনা হয়।
এর আগে গত ২৮ জুন নোয়াখালী জুম্মাপাড়া এলাকা থেকে পল্লী চিকিৎসক কামাল উদ্দিনকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয়। পরিবারের দাবি, মুক্তিপণ দেওয়ার পর তিনি ফিরে এলেও অপহরণের সময় নির্যাতনের কারণে এখনো অসুস্থ।
স্থানীয়দের দাবি, বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী ও কচ্ছপিয়া পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। সাম্প্রতিক ঘটনায় শতাধিক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।
গত ২২ জুলাই জুম্মাপাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে পাহাড়সংলগ্ন অনেক বাড়ি ফাঁকা দেখা যায়। কয়েকজন বাসিন্দা জানান, নিরাপত্তার কারণে তাঁরা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন এবং প্রয়োজন ছাড়া নিজ বাড়িতে ফিরছেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা রুবী আক্তার বলেন, “রাতে প্রায়ই গোলাগুলি হয়। আতঙ্কের কারণে বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।”
আরেক বাসিন্দা নাজমা আক্তার বলেন, “গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কে দরজা বন্ধ করে থাকতে হয়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিবার নিয়ে উদ্বেগে আছি।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় প্রায়ই গুলির শব্দ শোনা যায়। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে শতাধিক পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
বাহারছড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, তাঁর ওয়ার্ডে ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবারের বসবাস। সাম্প্রতিক অপহরণ, মুক্তিপণ ও গোলাগুলির ঘটনায় অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার তার ওয়ার্ড থেকেই এলাকা ছেড়েছে। তিনি বলেন, “মানুষ আতঙ্কে এলাকা ছাড়ছে। দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।”
নোয়াখালী জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাকের বলেন, তাঁর বাড়ির আশপাশের অন্তত ১০টি পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের টেকনাফ পৌরসভার একটি ভাড়া বাসায় রেখেছেন। তাঁর ভাষ্য, “আমি দিনে বাড়িতে থাকি, কিন্তু নিরাপত্তার কারণে রাতে অন্যত্র অবস্থান করি।”
স্থানীয় পান ব্যবসায়ী মো. সাব্বির বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন।
উপজেলা সদর থেকে বাহারছড়া ইউনিয়নের জুম্মাপাড়ার দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থেকে এলাকাটির দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার।
স্থানীয়দের দাবি, অপহরণ বা সশস্ত্র হামলার খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পুলিশের প্রায় আধা ঘণ্টা সময় লাগে। এর মধ্যে অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে চলে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সশস্ত্র ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কয়েকটি গোষ্ঠী অপহরণে জড়িত। তাঁদের দাবি, অপহরণের পর ভুক্তভোগীদের পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। তবে এসব ঘটনায় কারা জড়িত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, অতীতে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত কয়েকটি চক্র বর্তমানে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, এসব চক্র সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর আর্থিক অবস্থা, প্রবাসী স্বজন ও পারিবারিক তথ্য সংগ্রহ করে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইমরান বলেন, গত মে মাসে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা মুক্তিপণ দেওয়ার পর তিনি ফিরে আসেন।
তাঁর ভাষ্য, “মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অপহরণকারীরা তাকে অমানবিক নির্যাতন করেছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তবে এসব গোষ্ঠীর অবস্থান ও কার্যক্রম সম্পর্কে পাওয়া তথ্যের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগে যেসব ব্যক্তির নাম এসেছে, তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফের পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় গত তিন বছরে অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গত এক বছরে ১৫টি ঘটনায় প্রায় ১৫৫ জনকে অপহরণ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৯৬ জন রোহিঙ্গা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অধিকাংশ ভুক্তভোগী মুক্তিপণ দেওয়ার পর ফিরে এসেছেন।
চলতি বছরও অপহরণের পাশাপাশি সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ৩ মে নোয়াখালীপাড়া ব্রিজ এলাকায় অপহরণের চেষ্টার সময় শহীদ উল্লাহ (১৯) গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে এপ্রিলে সুমাইয়া নামে এক তরুণী গুলিতে নিহত হন। একই সময়ে পাহাড়ি এলাকা থেকে বস্তাবন্দি অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির খণ্ডিত মরদেহ এবং আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ, হত্যা ও সশস্ত্র সহিংসতার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পাহাড়ঘেঁষা জনপদে নিরাপত্তাহীনতা আরও তীব্র হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ ও পরিসংখ্যানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অপহরণ, মুক্তিপণ ও সহিংসতার ঘটনা বাড়তে থাকায় গত ৪ জুলাই টেকনাফে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে বিশেষ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অপহরণপ্রবণ এলাকায় পুলিশ চৌকি স্থাপন এবং বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলেন, বিশেষ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বাহারছড়ায় যৌথ অভিযান ও পুলিশ চৌকি স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, “দ্রুত যৌথ অভিযান শুরু না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।”
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, “টেকনাফকে অপরাধমুক্ত করতে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করবে। অপহরণ, মাদকসহ অন্যান্য অপরাধ দমনে দ্রুত অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে। অপহরণপ্রবণ এলাকায় পুলিশ চৌকি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।”
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, টেকনাফে অপহরণ ও মাদক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে এবং অপহরণপ্রবণ এলাকায় টহল জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, “বাহারছড়ায় অপহরণ ও সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে বড় পরিসরে যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পুলিশ চৌকি স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করা হয়েছে।”
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, অপহরণ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। “অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, বিশেষ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি রয়েছে। “টানা বৃষ্টির কারণে অভিযান শুরু করা যায়নি। এখন দ্রুত অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরু হবে। ইতিমধ্যে বাহারছড়া এলাকায় পুলিশের মোবাইল টিম মোতায়েন করা হয়েছে।”
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল রহমান বলেন, “অপহরণ ও মুক্তিপণের ঘটনায় তথ্য পাওয়া গেলে জড়িতদের শনাক্ত করে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হবে।”
প্রতিবেদনে স্থানীয় বাসিন্দারা কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও সহিংস কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।






