কবি আবদুল হাই শিকদার বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অনিবার্যই ছিল। কারণ, জুলাইয়ের রক্তে মিশে আছে পলাশীর বক্ষবিদীর্ণ করা হাহাকার, মিশে আছে বরকত-রফিকের রক্ত, মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের আত্মত্যাগের অসীম ব্যঞ্জনা। মিশে আছে শহীদ জিয়ার রক্ত, দেশপ্রেম, সততা ও সৌন্দর্য। জুলাই অজর, অমর। এই জুলাই হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দিয়েছে।
বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুরে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-এর সেন্ট্রাল অডিটোরিয়ামে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী।
আবদুল হাই শিকদার বলেন, জুলাইয়ের ডাক ছিল—‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ; যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তুমিই বাংলাদেশ।’ এই একটি মন্ত্রে জেগে উঠেছিল ছাত্র-জনতা। বুলেটের সামনে বুক টান করে দাঁড়ানো যে আবু সাঈদ, তার মতো বীর এক হাজার বছরের ইতিহাসে নেই। তখনই বুঝেছিলাম, দেশের ছেলে-মেয়েরা প্রাণ দিতে শিখে গেছে। দুনিয়া কাঁপানো ৩৬ দিনে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এই যুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের প্রতি আমার হৃদয় থেকে শ্রদ্ধা রইল।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই শিকদার বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ আমি নিজের কানে যখন শহীদ জিয়ার মুখে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনলাম, সেদিন ঈদের দিনের মতো খুশি হয়েছিলাম—এই ভেবে যে, আমার মাতৃভূমি স্বাধীন হবে। এরপর যখন যুদ্ধ শেষ করে ফিরলাম, সেদিন কী যে আবেগে ও খুশিতে মাটিতে গড়াগড়ি করে কেঁদেছি! আরেকটি দিন আমাকে আশ্চর্য করে দিয়েছিল, সেটি ১৫ আগস্ট। শেখ মুজিবুর রহমানের চলে যাওয়া। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে কী পথ ছিল, এটা ছাড়া? সমস্ত দরজা-জানালা তিনি নিজেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এর ফলে আঘাত আসার পর তার পাশে কেউ ছিল না। সহকর্মীরাই তাকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেছিল। ১৬ ডিসেম্বর যে স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ ছিল, সেই স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবে।
জুলাই নিয়ে হানাহানির প্রসঙ্গে আবদুল হাই শিকদার বলেন, এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ভারতীয় প্রভাব প্রবল। পোশাক, মিডিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের আগ্রাসন রয়েছে। এর একটাই কারণ—আমাদের বিভেদ। দুই বছর না যেতেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যারা জুলাইয়ে একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তারা আজ ভিন্ন ভিন্ন পথে হাঁটছে। এর কারণ কী? কেন আমরা আধিপত্যবাদের জন্য পথ করে দিচ্ছি? খাল কেটে কুমির আনছি। এই দূরত্বের কারণে আওয়ামী লীগ আসুক বা না আসুক, একটি বিশেষ রাষ্ট্রের উপকার হচ্ছে। আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ হাসমত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইআইইউসির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শাহজাহান। স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর মোস্তফা মনির চৌধুরী। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ কাশেম এবং প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কাউসার আহমেদ। কবিতা আবৃত্তি করেন আইআইইউসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মোস্তাক খন্দকার।
এর আগে সকাল ১০টায় দিবসটি উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি চত্বর থেকে একটি বিজয় র্যালি বের করা হয়। আলোচনা সভায় জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতিচারণ করেন। জুলাই স্মরণিকা মোড়ক উন্মোচন এবং দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
বার্তা বাজার/আইকে






