প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মোহাম্মদ রাশেদ খাঁন ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের টকশো ‘স্বাধীন সংলাপ’-এ তুমুল বাগযুদ্ধে জড়ানোর পর এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পাল্টাপাল্টি পোস্ট করেছেন।
আজ মঙ্গলবার পৃথক ফেসবুক পোস্টে একে অপরকে ইঙ্গিত করে নানা মন্তব্য করেন দুই রাজনীতিক।
এর আগে সোমবার (১৭ আগস্ট) রাতে এটিএন নিউজের নিয়মিত আয়োজন ‘স্বাধীন সংলাপ’-এর সাম্প্রতিক পর্বে বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রমের মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তর্কে জড়ান রাশেদ খান ও সারোয়ার তুষার।৪২ মিনিটের ওই আলোচনার শেষ দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উপস্থাপিকা রাশেদকে উদ্ধৃত করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নিয়ে একটি প্রসঙ্গে যেতে চাইলে তুষার রাশেদের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
একপর্যায়ে রাশেদকে উদ্দেশ করে তুষার বলেন, ‘উনি (রাশেদ) শতভাগ চ্যালেঞ্জ করে এমন অনেক কথাই বলেন। মিথ্যা কথা বলায় ওনার বিরাটৃ আছে।’ এরপর থেকে মূলত টকশো আর এগোতেই পারেনি। জুলাই আন্দোলনে কার ভূমিকা কেমন ছিল, কে মামলা খেয়েছে আর কে খায়নি- সেসব নিয়ে তর্কে জড়ান দুই বক্তা।
এ প্রসঙ্গে মঙ্গলবার দুপুর ১টা ১৯ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে সারোয়ার তুষারের বক্তব্যের জবাব দেন রাশেদ খাঁন।
তিনি বলেন, ‘গতকাল এটিএন নিউজ টকশোতে আমি পুরোটাই গঠনমূলক কথা বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সারোয়ার তুষার শেষ পার্টে এসে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে অ্যাটাক করে বলেছে, মিডিয়া দেখলে সবার আগে, আর পুলিশ দেখলে সবার পরে থেকেছি! এটা নাকি তাকে গণঅধিকার পরিষদের নেতারা বলেছে! কোন নেতারা? যারা গণঅভ্যুত্থানের পরপর এনসিপিতে যুক্ত হয়েছে! অথচ আমি ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনাকে কটুক্তির মামলায় জেল খেটেছি, ১৫ দিন রিমান্ডের নির্যাতনের শিকার হয়েছি। এর প্রেক্ষিতে সে আমাকে বলেছে, জেল তো চুরির মামলায়ও হয়! তার কাছে জেল-জুলুমের কোন মূল্য নাই! অথচ আমি ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুগপৎ আন্দোলনে রাজপথে থেকে ভূমিকা রেখেছি। সে সময় তাকে কখনো রাজপথে দেখি নাই।’
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে নিজের ভূমিকার প্রসঙ্গে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘আর ২০২৪ এর আন্দোলনে আমি তো ছাত্র না যে নেতৃত্ব দেবো। শেখ হাসিনা মানুষ হত্যা শুরু করলে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের সাথে রাজনৈতিক সমন্বয় করেছি।’রাশেদের দাবি, গণঅভ্যুত্থানের সময় নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আখতার হোসেনদের সঙ্গে জাতিসংঘের বাংলাদেশ প্রতিনিধির বৈঠক তার মাধ্যমে হয়েছিল।
১৮ জুলাই তিনি সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ও আহনাফ সাঈদ খানকে আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান এবং এ নিয়ে সমন্বয়ের কাজ শুরু করেন বলেও দাবি করেন। পাশাপাশি আহনাফ সাঈদ খানের কাছে কর্মসূচি বাস্তবায়নে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
রাশেদ আরও বলেন, ‘১৯ জুলাই নুরুল হক নুরকে গ্রেপ্তার করার পরে আমার বাসায় ২ বার অভিযান চালায়। এরপর আমি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর (সালাহউদ্দিন আহমদ) নেতৃত্বে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলন সফল করতে রাজনৈতিক কর্মপন্থা নির্ধারণে কাজ করেছি। না কি সেসময় আন্দোলন নিয়ে কাজ না করে এরেস্ট হলে এরা (নব্য বিপ্লবীরা) খুশি হতো? ভুলে যেয়েন না, সমন্বয়করাও আত্মগোপনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে।’
আন্দোলনের শেষ পর্যায়ের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, ‘এছাড়া যখন আন্দোলন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, নতুনভাবে আন্দোলন শুরু করার জন্য ৩১ জুলাই বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও আইনজীবীরা যে হাইকোর্টের সামনে নামলো, সেটাও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আমি পরামর্শের ভিত্তিতে ঠিক করেছিলাম। ৩ আগস্ট আমি গ্রেপ্তার ঝুঁকি নিয়ে শহীদ মিনারে গিয়েছি এবং সমন্বয়কদের সঙ্গে কথা বলেছি, গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনে সম্পৃক্ত থেকেছি। তখনও আমাকে গ্রেপ্তার করার জন্য তন্নতন্ন করে খুঁজেছে।’
টকশোতে সারোয়ার তুষারের সঙ্গে বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘যাইহোক, গতকালের টকশোতে সারোয়ার তুষার আমাকে জিজ্ঞেস করেছে প্রধানমন্ত্রী কোথায় ছিলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোথায় ছিলো। আমি উত্তর দিয়েছি, তারা নির্বাসিত ছিলো, সেখান থেকে কাজ করেছে। আমি এর প্রেক্ষিতে তাকে প্রশ্ন করেছি, আপনি কোথায় ছিলেন? সে উত্তরে বলেছে, ১৯ জুলাই মাঠে ছিলো। আমি বলেছি, আগে পরে কোথায় ছিলেন, সে উত্তর না দিয়ে আমাকে আক্রমণ করতেই থাকে এবং বেয়াদব ও মিথ্যুক বলে। আমি প্রথমবার তাকে কিছু বলি নাই, কিন্তু ২য় বার আবারও বেয়াদব বলাতে আমি পাল্টা জবাব বলেছি।’
এ প্রসঙ্গে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ইমতিয়াজ মির্জার একটি ফেসবুক পোস্টের কথাও তুলে ধরেন রাশেদ। এ প্রসঙ্গে তিনি পোস্টে বলেন, ‘ইমতিয়াজ মির্জা ভাই লিখেছেন, ‘‘সারোয়ার তুষারকে ২০২৪ জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে আমাদের ‘প্রগ্রেসিভ বিএএফ’ গ্রুপে যুক্ত করি। জুলাইয়ে আমাদের সব এক্টিভিটির হাব ছিলো প্রগ্রেসিভ বিএএফ, কারন ইয়াং ক্রাউড ছিলো আর দ্রুত এ্যাকশন নেয়া যেতো। ঠিক আগস্টের ২-৩ তারিখে আওয়ামী লীগ গুজব ছড়িয়ে দেয়, হোয়াটসএ্যাপ গ্রুপ গুলোতে যারা থাকবে তাদেরকে গ্রেফতার করা হবে। যে শোনা সেই কাজ, সারোয়ার তুষার এর মত বিশাল বিশাল বিপ্লবীরা গ্রুপ থেকে চম্পট দেয়’’।’
সবশেষে সারোয়ার তুষারের সঙ্গে বিতর্কের বিষয়ে রাশেদ খাঁন বলেন, ‘আমাকে কেউ ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করবে, আর আমি তাকে চুমু দিবো! এমন সুশীল ব্যক্তি আমি না। আপনারা শব্দের রাজনীতি করতে চান, আবার এতো চেতেন কেন? নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতির কথা বলে ভণ্ডবস্তের রাজনীতির সূচনা করেছেন। এগুলো পরিহার করুন, নতুবা ইতরের সঙ্গে ভদ্রতা দেখানোর রাজনীতি বাংলাদেশের বাস্তবতায় কারও পক্ষে সম্ভবপর হবে না। ভদ্রতা আপনার পক্ষ থেকে আসলে, আমার পক্ষ থেকে আরও বেশি আসবে।’
রাশেদের ওই পোস্টের পর তাকে ইঙ্গিত করে পাল্টা জবাব দেন সারোয়ার তুষারও। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীকে উদ্দেশ্য করে ফেসবুক পোস্টে এনসিপির এ নেতা দাবি করেন, দেনদরবার বা লবিং করে তিনি টকশোতে যান না। তাকে টকশোতে ডাকতে কারও মাধ্যমে অনুষ্ঠান প্রযোজকদের তদবিরও করান না।সারোয়ার তুষার লিখেছেন, ‘আমি দেনদরবার কিংবা লবিং করে টকশোতে যাই না। আমাকে টকশোতে যেন ডাকে সে জন্য অমুক-তমুককে দিয়ে টকশো প্রডিউসারদের তদ্বিরও করাই না। সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে টেলিভিশন হাউজগুলোকে চাপ দিয়ে নিজেকে টকশো আলোচক বানাই নাই।’
‘এমন দলছুট ভ্যাগাবন্ড কারো কারো কথা জানি, যারা হাউজগুলোতে সরকারি ক্ষমতার জোরে চাপ সৃষ্টি করে টকশোতে যায়৷ কারণ সরকারের কাছ থেকে যে খুদকুঁড়া পায়, তা হালাল করতে হবে তো! আমি কারো নাম নেই নাই, কিন্তু দেখবেন ঠিকই জায়গামতো গিয়ে ঢিলটা পড়বে!’ যোগ করেন তিনি।
‘মিডিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক শতভাগ অর্গানিক’ উল্লেখ করে তুষার বলেন, ‘বিভিন্ন নিউজের জন্য বাইট দেয়া, টকশোতে যাওয়া, কোথাও কথা বললে সেটা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা— আমার প্রতি মিডিয়ার এই মনোযোগের জন্য আমি এতটুকু দেনদরবার, তদ্বির করি নাই। এর সবচেয়ে বড় সাক্ষী হাউজগুলোর সিইও, সিএনই ও প্রডিউসাররা।’
শেষে ইংরেজিতে তিনি লেখেন, ‘Street dogs won’t define me (রাস্তার কুকুরের কথায় আমার পরিচয় তৈরি হয় না)।’






