যুক্তরাষ্ট্র ফের যুদ্ধ শুরু করলে ইউরোপে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে ইরান। ইরানের ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তির বরাতে এ খবর জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
প্রতিবেদন মতে, ইরানের শাসক মহলের ঘনিষ্ট একজন জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করেছে ইরানি বাহিনী। এর মধ্যে বুলগেরিয়ার বেজমের বিমানঘাঁটিও রয়েছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানকে ওই ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয় বুলগেরিয়া।
অন্য একজন জানিয়েছেন, সাইপ্রাসও সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার তালিকায় রয়েছে। গত মার্চে সাইপ্রাসে থাকা একটি ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয়েছিল। ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক কেবলগুলোতেও হামলার সম্ভাবনা আলাদাভাবে পর্যালোচনা করেছে বলে জানান ওই দুই ব্যক্তি।
ইরানের এমন অবস্থান দেশটির ক্ষমতাসীন মহলে যুদ্ধ নিয়ে ক্রমবর্ধমান কঠোর মনোভাবের প্রতিফলন। সেখানে অনেকেই মনে করছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হবে কি না, তার চেয়ে কবে শুরু হবে সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা নিয়ে আলোচনা স্থবির হয়ে আছে। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি শীর্ষ নিরাপত্তা ও সামরিক পদে কট্টরপন্থীদের নিয়োগ দিয়েছেন। মঙ্গলবার ট্রাম্পও বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা বৈঠক চলছে না এবং নির্ধারিতও নেই।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং দেশটির অন্যান্য সামরিক কমান্ডাররা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলার আগের কৌশলের বাইরে যাবে। প্রয়োজনে আরও দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালানো হবে।
গত মাসে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের কারণে যুক্তরাজ্যকেও হুঁশিয়ারি দিয়েছিল আইআরজিসি। তারা বলেছিল, ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালাতে যে কোনো ঘাঁটি ব্যবহার করা হলে সেটিকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল বলেন, ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি ‘বাস্তব, তবে সীমিত’।
তার মতে, ইরান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে থাকা মার্কিন স্থাপনায় শাহাব সিরিজের মতো মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। তবে দূরত্ব বাড়লে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র কী করে তার ওপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন ইরানের ক্ষমতাসীন মহলের ওই দুই ব্যক্তি। তাদের একজন বলেন, ট্রাম্প যদি ইরানের অবকাঠামোয় হামলার আগের হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে সংঘাত আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে তেহরান।
গত মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান কোনো জাহাজে হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবার একটি করে ইরানি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবে।
অন্যজন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসন চালালে ইরানের পাল্টা জবাবের ক্ষেত্রে ‘কোনো সীমা থাকবে না’। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ‘অতিরিক্ত দূর এগিয়ে গেলে’ ইরান যে কোনো মূল্যে আত্মরক্ষা করবে, প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গিয়ে ইউরোপেও হামলা চালাবে।
দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতার ইঙ্গিত আগেও দিয়েছে ইরান। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছিল, ইরান ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ঘাঁটিটি ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে। তবে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছায়নি।
মার্চে তুরস্ক জানিয়েছিল, ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। একই মাসে সাইপ্রাসের আকরোতিরিতে থাকা ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা হয়। সে সময় পশ্চিমা কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, এটি ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে পরিচালিত কোনো ইরানি ড্রোন হতে পারে।
প্রতিবেদন মতে, ইরানের ক্ষমতাসীন মহলের ওই ব্যক্তিরা আরও দাবি করেন, গত মাসে জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা ছিল দেশটির সবচেয়ে নিখুঁত দূরপাল্লার হামলা। ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন। তাদের মতে, হামলাটি দীর্ঘ দূরত্বে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ইরানের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
তাদের একজন বলেন, এই হামলার মাধ্যমে ইউরোপকেও একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। ইরান ইউরোপে ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছাতে পারে, তাই চলমান যুদ্ধে ইউরোপের অবস্থান কী হওয়া উচিত, তা তাদের জানা দরকার। ইরানের অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা হলে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।






