মুহাম্মদ গুরা মিয়া ও জাহিদা বেগম দম্পতির ঘরটি বাইরে থেকে দেখলে আর দশটি ঝুপড়ির মতোই। বাঁশের বেড়া, কাঠের খুঁটি আর ত্রিপালের ছাউনি। ছোট্ট ঘরটিতে এখন ১২ জনের সংসার। মিয়ানমারের বুথেডং সিন্ডিপ্রাং থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে ৯০ এর দশকে বাংলাদেশে এসেছিলেন গুরা মিয়া। তখন তাঁর পরিবারে সদস্য ছিল দুইজন।
সময়ের সঙ্গে গুরা মিয়ার পরিবারে সদস্য বেড়েছে ছয় গুণ, কিন্তু থাকার জায়গাটি রয়ে গেছে আগের মতোই। তাই বাধ্য হয়ে ঘরের ওপর আরেকটি কক্ষ বানিয়েছেন তিনি। কাঠ-বাঁশ দিয়ে মাচায় তৈরি সেই কক্ষ যেন একটি পরিবারের বেড়ে ওঠার গল্পের পাশাপাশি কক্সবাজারের লেদা ক্যাম্পের আবাসন সংকটের প্রতিচ্ছবি। শুধু এই পরিবার নয় লেদা ক্যাম্পে এমন বহু পরিবার আছে, যাদের সদস্য সংখ্যা অনেক বেড়েছে কিন্তু বসতির পরিধি বাড়েনি। কেউ পুরোনো ঝুপড়ির ওপর নতুন কক্ষ তুলছেন, কেউ ঘরের ভেতর জায়গা ভাগ করছেন, আবার কেউ সন্তানদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
২০১৭ সালের আগস্টের সেই রোহিঙ্গাদের ঢলের নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। টেকনাফ শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে লেদা ক্যাম্পে নতুন-পুরোনো মিলে সাড়ে ৭ হাজারের বেশি পরিবারের সদস্য সাড়ে ৩৬ হাজারের বেশি। এ ছাড়া কক্সবাজারে আরও ৩২টি ক্যাম্পে ১২ লাখ রোহিঙ্গার বসতি। গুরা মিয়া নিজের ছোট্ট ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘মিয়ানমারের বাড়ি ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় পরিবারের সদস্য ছিল দুইজন। এখন সদস্য ১২। আমার বয়স যখন ৩০ বছর, তখন প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে আসি।’
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল শুরু হয়েছিল। ইতোমধ্যে নয় বছর পেরিয়ে গেলেও কবে মিয়ানমারে তাদের ফেরত পাঠানো হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিবছর জন্ম নেয় ৩০ হাজার শিশু। এ হিসাবে গত আট বছরে দুই লাখ ৭০ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে।
কমছে সহায়তা
২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও অংশীদাররা রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ দশমিক পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আবেদন করেছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম এবং জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ মূলত জীবন রক্ষাকারী ন্যূনতম সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন। ইউএনএইচসিআর বলছে, তাদের আশ্রয় সহায়তার মধ্যে জরুরি মেরামত, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নতুন আশ্রয় নির্মাণের কার্যক্রম রয়েছে। পর্যাপ্ত জায়গা, নিরাপত্তা ও দুর্যোগ থেকে সুরক্ষার বিষয়টি এসব কার্যক্রমে গুরুত্ব পাচ্ছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানও বলেছেন, প্রত্যাবাসন শুরু না হলে সংকটের সমাধানের আশা নেই। একই সঙ্গে তিনি অর্থায়ন কমে যাওয়ার কারণে সংকট আরও তীব্র হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। ২০২৬ সালে সরকার রোহিঙ্গা বিষয়ে নতুন জাতীয় সমন্বয় কাঠামোও করেছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা ও প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে সমন্বয় বাড়ানো।
প্রত্যাবাসনে বাধা
মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আবারও ‘বাঙালি’ দাবি করে সম্প্রতি নতুন একটি বিবৃতি দিয়েছে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ব্যক্তিদেরই ফেরত নেওয়া হবে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রোহিঙ্গারা বলছে, এটি প্রত্যাবাসনের বড় বাধা। মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের নামে নাটক করছে। মূলত তারা রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে চায়।
নতুন করে আসছে রোহিঙ্গা
অনিশ্চিত প্রত্যাবাসন রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে রোহিঙ্গাদের নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশও বন্ধ হয়নি। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা রেজাউল করিম বলেন, ‘আরাকান আর্মি আমার চাচাকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করছে। তাদের নির্যাতনের কারণে আমি এক মাস আগে বাংলাদেশে চলে আসি। এখন দুই ভাই-বোনের জন্য চিন্তায় আছি।’
২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত নতুন করে আগত ও নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এক লাখ ৫২ হাজার ২৯। নতুনদের যুক্ত করে ক্যাম্পগুলোতে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৩ লাখ। এর বাইরে আরও ২৫ থেকে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। প্রতিবছর ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্ম নেওয়ায় প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ক্যাম্পের ওপর চাপও। পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। ক্যাম্পগুলোতে সংঘাত, হত্যাকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক কারবার, অপহরণ এবং মানব পাচারের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনাও তৈরি হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শরণার্থী শিবির থাকুক। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে তারা এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এটি এক ধরনের তামাশা। আন্তর্জাতিক সমাজ যতদিন এক হয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না, ততদিন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে ভারত, চীন ও রাশিয়া। এই তিন দেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে নিজেদের স্বার্থ থেকে সরে না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে। এখন বিএনপি সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেটি পরিষ্কার বলা যাচ্ছে না।’






