ঢাকা   মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

প্রধান শিক্ষক ছাড়াই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৪০৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়

Authorস্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম

প্রধান শিক্ষক ছাড়াই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৪০৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়

সকালে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, এরপর বিদ্যালয়ের হিসাব-নিকাশ, দাপ্তরিক চিঠিপত্র, অনলাইন কার্যক্রম, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং উপজেলা পর্যায়ের সভায় অংশগ্রহণ—একজন শিক্ষককেই সামলাতে হচ্ছে এসব কাজ। অথচ তাঁর মূল দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা। প্রধান শিক্ষক না থাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৪০৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে এভাবেই চলছে প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১ হাজার ১০৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন ৬৯৬ জন। অর্থাৎ ৪০৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে।

শুধু প্রধান শিক্ষক পদেই নয়, উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতেও রয়েছে বড় ধরনের জনবল সংকট। জেলার নয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অনুমোদিত ৫৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন। শূন্য রয়েছে ৩৫টি পদ। ফলে বিদ্যালয় পরিচালনা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের তদারকি—সব ক্ষেত্রেই জনবল সংকটের প্রভাব পড়ছে।

নবীনগরে সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ
জেলার মধ্যে প্রধান শিক্ষক পদ সবচেয়ে বেশি শূন্য রয়েছে নবীনগর উপজেলায়। সেখানে অনুমোদিত ২১৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১২৯ জন। শূন্য রয়েছে ৯০টি পদ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় ১২৯টি পদের মধ্যে কর্মরত ৭৫ জন, শূন্য ৫৪টি। সরাইলে ১২৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৭৫ জন, শূন্য ৫১টি। কসবায় ১৬৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১১৪ জন, শূন্য ৪৯টি।

বিজয়নগরে অনুমোদিত ১০০টি পদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন ৫২ জন। শূন্য রয়েছে ৪৮টি পদ। বাঞ্ছারামপুরে ১৩৯টির মধ্যে কর্মরত ১০০ জন, শূন্য ৩৯টি। নাসিরনগরে ১২৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৯০ জন, শূন্য ৩৬টি।

এ ছাড়া আশুগঞ্জে ৪৯টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত ২৭ জন, শূন্য ২২টি। আখাউড়ায় ৫৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৩৪ জন, শূন্য রয়েছে ২০টি পদ।

প্রশাসনিক দায়িত্বে ভারপ্রাপ্ত, চাপে পাঠদান
প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে ভারপ্রাপ্তদের। ফলে শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয়গুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

একজন সহকারী শিক্ষককে নিজের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের হিসাব-নিকাশ, দাপ্তরিক কাজ, অনলাইন কার্যক্রম, বিভিন্ন সভায় অংশগ্রহণসহ প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। এতে তাঁর নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

এর বাস্তব চিত্র দেখা গেছে আশুগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম তালশহর পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষিকা জোনিয়া বেগম জানান, ৩২৪ জনের বেশি শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। এর মধ্যে দুজন বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। বাকি তিনজনের একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।

জোনিয়া বেগম বলেন, “মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে সবকিছু সামলাতে হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রশাসনিক কাজ, উপজেলা পর্যায়ের সভাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এতে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।”

তিনি বলেন, শিক্ষকসংকটের বিষয়টি জানিয়ে একাধিকবার সংযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক দেওয়ার কথা বলা হলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি।

দীর্ঘদিনের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থায় স্থবিরতা
কসবা উপজেলার শ্যামবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক জহিরুল ইসলাম স্বপন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জেলার অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রায় এক দশক ধরে অনেক বিদ্যালয় চলতি বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন জটিলতা ও দীর্ঘদিনের মামলার কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতিও দীর্ঘ সময় আটকে ছিল।

জহিরুল ইসলাম স্বপনের ভাষ্য, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা মূলত সহকারী শিক্ষক পদেই বহাল থাকেন এবং ওই পদের বেতন পান। প্রধান শিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁরা মাসে মাত্র দেড় হাজার টাকা দায়িত্বভাতা পান।

তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জটিলতা প্রাথমিক শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মামলার জটিলতা কাটলেও প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে সংকট নিরসনে সময় লাগছে।

উপজেলা শিক্ষা অফিসেও জনবল সংকট
বিদ্যালয়ের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতেও জনবল সংকট প্রকট। জেলার নয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অনুমোদিত ৫৫টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন। শূন্য রয়েছে ৩৫টি পদ।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকা এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেও পড়তে পারে।

নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে: জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা
প্রধান শিক্ষক সংকটের বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বলেন, শূন্য পদগুলো পূরণে পর্যায়ক্রমে নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। নিয়োগ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে প্রধান শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে ৪০৯টি শূন্য পদে কবে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেননি।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জটিলতা নিরসন করা জরুরি। দীর্ঘদিন একটি বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালিত হলে প্রশাসনিক দায়িত্বের চাপ যেমন বাড়ে, তেমনি সেই চাপের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেও।

তাই প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রুত শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন