চেয়ারম্যান নেই। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া প্যানেল চেয়ারম্যান-১ মারা গেছেন। নিয়ম অনুযায়ী এবার দায়িত্ব পাওয়ার কথা প্যানেল চেয়ারম্যান-২-এর। কিন্তু তিনি দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে অনাস্থা প্রস্তাব। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের পাশাপাশি তাকে দেওয়া হয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিশ।
পরে তাকে বাদ দিয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান-৩-কে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার উদ্যোগ নেওয়া হলে বিষয়টি গড়িয়েছে আদালতে। হাইকোর্ট ওই অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর চার মাসের স্থিতাবস্থা দিয়েছেন। রাজশাহীর পবা উপজেলার হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে এমন জটিলতা। প্যানেল চেয়ারম্যান-২ জয়নাল আবেদীন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনার কোনও আইনগত ভিত্তি নেই। এ বিষয়ে তিনি আরও বলেছেন, ‘বিয়ের আগেই তালাক? বিয়েই হলো না, আর তালাক হয়ে গেলো কীভাবে?’
জয়নাল আবেদীন পেশায় আইনজীবী। তার ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদ গঠনের পর প্রথম সভাতেই প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচন করে রাখতে হয়। চেয়ারম্যান ছুটিতে থাকলে, অসুস্থ হলে, দায়িত্ব পালনে অনিচ্ছুক হলে কিংবা মারা গেলে প্যানেল চেয়ারম্যানদের মধ্য থেকে একজন দায়িত্ব পালন করেন। এ জন্য আলাদা করে কোনও আদেশের প্রয়োজন হয় না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হড়গ্রাম ইউপির চেয়ারম্যান ছিলেন জামায়াতের নেতা আবুল কালাম আজাদ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ওই নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী শফিকুল হক মিলনের কাছে পরাজিত হন। চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হওয়ার পর প্যানেল চেয়ারম্যান-১ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মুনজুর রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। অসুস্থতার কারণে গত ১৭ আগস্ট তার মৃত্যু হয়।
তবে ইউপি ও উপজেলা প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, মুনজুর রহমান জীবিত থাকতেই তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। গত ২৩ জুলাই ছয় জন সাধারণ সদস্য ও তিন জন সংরক্ষিত নারী সদস্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে ওই প্রস্তাব দেন। আবেদনে বলা হয়, মুনজুর রহমান ভারতে চিকিৎসার জন্য ২৯ জুন থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত ছুটিতে ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে প্যানেল চেয়ারম্যান-৩ রুপালী পারভীনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
ওই আবেদনে প্যানেল চেয়ারম্যান-১ এর অনুপস্থিতিতে প্যানেল চেয়ারম্যান-২ জয়নাল আবেদীনকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে অনাস্থা জানানো হয়। তবে তখনও জয়নাল আবেদীন দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। তাকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হবে না বা তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে, আবেদনে তা স্পষ্ট করা হয়নি। এরপর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন খানকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তিনি গত ২৮ জুলাই জয়নাল আবেদীনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।
জয়নাল আবেদীনের প্রশ্ন, অনাস্থার ক্ষেত্রে সাধারণত অনিয়ম, দুর্নীতি বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার মতো বিষয় সামনে থাকে। কিন্তু তিনি দায়িত্বই গ্রহণ করেননি। তাহলে দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে কীভাবে আসে? জয়নালের অভিযোগ, তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে দূরে রাখার চেষ্টা চলছে। তিনি ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির। তার দাবি, প্যানেল চেয়ারম্যান-৩ রুপালী পারভীনকে দায়িত্ব দেওয়ার পথ তৈরি করতেই তার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনা হয়েছে।
রুপালী পারভীন ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য। তিনি আগে আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন, এখন বিএনপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত জানিয়ে তিনি বলেন, জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে অনাস্থার বিষয়ে পরে কথা বলবো।
এদিকে অনাস্থা প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন জয়নাল আবেদীন। হাইকোর্ট ওই অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর চার মাসের স্থিতাবস্থা দিয়েছেন। ফলে মঙ্গলবার ইউপি কার্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্ধারণের জন্য নির্ধারিত সভা শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়।
সভা স্থগিতের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন খান বলেন, মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সভা হওয়ার কথা ছিল। সোমবার (৩১ আগস্ট) তিনি হাইকোর্টের চার মাসের স্থিতাবস্থার বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর ইউএনওর সঙ্গে আলোচনা করে সভাটি বাতিল করা হয়েছে।
হড়গ্রাম ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদও মনে করেন, প্যানেল চেয়ারম্যান-১ মুনজুর রহমানের মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী প্যানেল চেয়ারম্যান-২ জয়নাল আবেদীনের দায়িত্ব পাওয়ার কথা। তার অভিযোগ, জয়নালকে দায়িত্ব দেওয়া থেকে বিরত রাখতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হচ্ছে।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিনি পাঁচবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকলেও প্যানেল চেয়ারম্যানদের দিয়েই পরিষদের দায়িত্ব পালন করিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া কি এসব হয়? রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই এটা হচ্ছে।’
তবে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে থাকা সদস্যদের বক্তব্য এবং প্রশাসনের আইনি ব্যাখ্যা এ বিষয়ে ভিন্ন হতে পারে। আদালতের স্থিতাবস্থার কারণে আপাতত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। ফলে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হওয়ার পর যে দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে জটিলতা শুরু হয়েছিল, তা এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।






