কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ ক্লাস দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের সমমান দিয়ে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে একটি আইন পাস হয়। যার মাধ্যমে মেলে বহুল প্রত্যাশিত কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি। কিন্তু কাগজে-কলমে মাস্টার্স স্বীকৃতির অর্ধযুগ পার হলেও এখনো বাস্তবে নেই এর কোনো প্রয়োগ। বিশেষত কওমি মাদরাসার যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চান এবং যাদের সরকারি-বেসরকারি নির্দিষ্ট পদগুলোতে চাকরির যোগ্যতা ও ইচ্ছা আছে তারা সনদের কার্যকারিতা না থাকায় প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন। কওমি শিক্ষার্থীদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আধৌ কি মিলবে স্বীকৃতির সুফল?
৫ আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল—দেশে পরিবর্তনের নতুন সূচনা হবে। অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন এসেছেও। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই পরিবর্তনের ছোঁয়া এখনো লাগেনি কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের জীবনে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বীকৃতি গ্রহণের পর কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড হাইয়াতুল উলিয়ার শরিক ৬ বোর্ডের দায়িত্বশীলদের সমন্বয়ে একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়; যাদের কাজ ছিল স্বীকৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা। তবে অভিযোগ রয়েছে সে সময় বারবার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রনালয়গুলোতে যোগাযোগ করেও কার্যত কোন সুফল পাওয়া যায়নি। এমনকি ৬ বোর্ডের দায়িত্বশীলসহ অনেকের অভিযোগ তখন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কওমি মাদরাসার এই স্বীকৃতিকে মেনে নেয়নি।
কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি প্রদান করা হয় কওমি মাদরাসাগুলোর সর্বোচ্চ অথরিটি আল হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কাওমিয়ার মাধ্যমে। সে হিসেবে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের দায়িত্ব বা দায়ভার এই সংস্থার ওপরই বর্তায়। কিন্তু এই সংস্থা সেই দায়িত্বগুলো কীভাবে সম্পাদন করছে? অর্ধযুগ পার হলেও এখনও কেন এই সনদের পুরোপুরি কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না? কোথায় গিয়ে আটছে আছে লাখো কওমি শিক্ষার্থীর স্বপ্নীল আশা-আকাঙ্খা? এসব বিষয়ে কথা হয় হাইয়াতুল উলিয়ার সদস্য ও বোর্ডগুলোর দায়িত্বশীলদের সঙ্গে।
এ প্রসঙ্গে কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক) মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, ‘কওমি স্বীকৃতির বড় একটা কার্যকারিতা হলো সামাজিকভাবে কওমি মাদরাসার শিক্ষা যে একটা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা তা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তবে শিক্ষার্থীরা যেন এ সনদের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চশিক্ষাসহ নানা সুফল পেতে পারে সেজন্য প্রক্রিয়া চলছে। আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি এই স্বীকৃতির কার্যকারিতা দ্রুতই দৃশ্যমান হবে।’
জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের মহাসচিব মুফতি মুহাম্মদ আলীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম সুফল পাওয়ার জন্য আপনারা কীভাবে কাজ করছেন? তিনি বলেন, স্বীকৃতি পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি নিজস্ব ফর্মুলায় তাদের কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সেই কমিটিতে আমিও আছি। আশা করছি স্বীকৃতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের যে আশা-আকাঙ্খা আছে তা পূরণ হবে, ইনশাআল্লাহ।
তার মতে, স্বীকৃতির সুফল যে একেবারেই আসেনি তেমনটি নয়। এখন শিক্ষার্থীরা নামের আগে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা (মাস্টার্স) লিখতে পারছেন, এটাও বড় পাওয়া বলে জানান তিনি। তবে স্বীকৃতি বিষয়ে রমজানের পর নতুন সরকার ও শিক্ষা শিক্ষামন্ত্রনালয়ের সাথে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কওমি স্বীকৃতির সার্বিক বিষয় যদি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায় তাহলে এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পথ সুগম হওয়া কঠিন কিছু না। এর জন্য দরকার কার্যকরী উদ্যোগ।
এদিকে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট অনেকের ধারণা, নিজেদের ব্যর্থতার কারণেই স্বীকৃতির সুফল ঘরে তুলে পারেনি কওমি সংশ্লিষ্টরা। এর পেছনে কার্যকরী উদ্যোগের কমতি, দায়িত্বশীলদের সময় উপযোগী সিদ্ধান্তের অভাবকেই দায়ী হিসেবে দেখছেন তারা।






