বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করতে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাস হওয়ার কথা নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিবেশই হয়ে উঠছে ভয়ের কারণ। র্যাগিং, বুলিং, বডিশেমিং ও ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনাগুলো নতুন শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে, যা কখনো কখনো চরম পরিণতির দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর র্যাগিংবিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হলেও, কিছু শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততায় এসব ঘটনা থামছে না। এর ফলে প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে; গত বছর বিভিন্ন বিভাগের ১৪ জন শিক্ষার্থীকে এক সেমিস্টার এবং ১৭ জনকে আজীবনের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। গত বছর মোট ৩১ জনকে র্যাগিংয়ের জন্য বহিষ্কার করা হয়৷
জানা যায়, গতবছর ২ জুলাই ২০২৫, মার্কেটিং বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের দ্বারা ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে র্যাগিংয়ের অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ১৭ জুলাই ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের সাতজন শিক্ষার্থীকে এক সেমিস্টারের জন্য বহিষ্কার এবং ১৭ শিক্ষার্থীকে আজীবন হল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
৬ জুলাই ২০২৫, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের পাঁচজন শিক্ষার্থীকে এক সেমিস্টার এবং আজীবন হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১ থেকে ১৬ জুলাই নবীন শিক্ষার্থীদের র্যাগিংয়ের অভিযোগে ১৫ আগস্ট লোকপ্রশাসন বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে এক সেমিস্টার এবং আজীবন হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। যদিও পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে, পরিবারের অনুরোধে, শর্তসাপেক্ষে একাডেমিক বহিষ্কারাদেশ শিথীল করা হয়।
র্যাগিংয়ের দায়ে বহিষ্কৃত ২০২৩-২৪ সেশনের লোক প্রশাসন বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, “এক ভুল বুঝাবুঝির কারনে আমার নামটা সামনে চলে আসে। পরে অভিবাবকের উপস্থিতিতে স্টাম্পে মুচলেখা নিয়ে সাজা শিথীল করা হয়। আমি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে শুরু থেকেই র্যাগিংয়ের বিপক্ষে ছিলাম। কারন আমরাও সিনিয়র কর্তৃক হেনস্তার শিকার হয়েছিলাম। তাই আমরা এর ভয়াবহতা বুঝতে পারি। তাই আমি চাই র্যাগিং, বুলিং সহ এই ধরনের কাজ গুলো ক্যাম্পাস থেকে দুরীভূত হোক।
গণিত বিভাগের ২০২১ -২২ সেশনের শিক্ষার্থী রনি আহমেদ বলেন, “একজন শিক্ষার্থী যখন পরিবার-পরিজন ছেড়ে প্রথমবার তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে (নতুন পরিবেশ) আসে তখন তারা এমনিতেই মানসিকভাবে দূর্বল থাকে, তার উপর এই র্যাগিং নামক মানসিক অত্যাচার কতটা ভয়াবহ হয় তা শুধু একমাত্র সেই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীই জানে। র্যাগ যারা দেয় তাদেরও তো একটু আনন্দ নেয়া ছাড়া এখানে বিরাট লাভবান হওয়ার কিছু দেখছি না। র্যাগ দিয়ে আনন্দ নিয়ে বহিষ্কার হয়ে গেলে তখন তার পড়াশোনার যে ক্ষতিটা হয়ে যায় তাও তো অপূরণীয়। তার থেকে র্যাগিংকে আমরা না বলি।আবার র্যাগিং-এর কঠোরতায় আমরা যেন ক্যাম্পাসে সিনিয়র-জুনিয়রের সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠার অন্তরায় না হয় সেদিকেও প্রশাসনকে খেয়াল রাখতে হবে।”
ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম বলেন, “র্যাগিংয়ে আমাদের সবসময় জিরো টলারেন্স। যদি কোন সিনিয়র জুনিয়রদের শারীরিক বা মানসিকভাবে হেনস্তা করে, তা আমাদের কাছে অভিযোগ আসে এবং তা প্রমানিত হয় তাহলে আমরা তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবো। গত বছরও আমরা র্যাগিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার ভিত্তিতে অনেক শিক্ষার্থীকে শাস্তির আওতায় এনেছি। এবছরও এরকম অভিযোগ আসলে এবং তা প্রমাণিত হলে শাস্তির আওতায় আনবো।”
তিনি আরও বলেন, “নতুন শিক্ষার্থীদের যাতে র্যাগিংয়ের শিকার না হতে হয় সেজন্য আমরা দফায় দফায় শিক্ষক শিক্ষার্থী এবং বিভাগের ছাত্র উপদেষ্টাদের সাথে বসেছি, স্যোশাল মিডিয়ায় ক্যাম্পেইন করেছি। আমরা আশা করছি এই বছর নতুন শিক্ষার্থী একটু স্বস্তিতে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করতে পারবে। তারপরও যদি কেউ র্যাগিংয়ের শিকার হয়, আমাদেরকে জানানোর অনুরোধ রইলো আমরা তা তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিবো।”
প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো: আব্দুল হাকিম বলেন, “গত বছর র্যাগিংয়ের প্রমাণ পাওয়ায় বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বহিঃষ্কার করা হয়েছিল তদন্ত কমিটির রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে। পরবর্তীতে তাদের অভিবাবকের উপস্থিতিতে স্ট্যাম্পে ভবিষ্যতে কোনো অপরাধ মূলক বা র্যাগিং কার্যক্রমে জড়িত থাকবে না এমন মুচলেখার মাধ্যমে সাজা শিথীল করা হয়েছে। কিন্তু এইবার প্রমান সাপেক্ষে সরাসরি প্রশাসনিক নীতিমালা অনুযায়ী বহিষ্কার করা হবে। আমরা এবার সকল চেয়ারম্যন, ছাত্র উপদেষ্টা এবং ছাত্র প্রতিনিধিদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছি যাতে র্যাগিং বিষয়ে সচেতনতা জোরদার করা হয়।”
বার্তা বাজার/এস এইচ






