পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলমানদের জীবনে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ত্যাগ, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য বার্তা বহন করে। আরবি ‘আজহা’ শব্দের অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ। সেই চেতনা ধারণ করেই প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে উদযাপিত হয় কোরবানির ঈদ। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানির মাধ্যমে মানুষ যেমন আত্মত্যাগের শিক্ষা লাভ করে, তেমনি সমাজে সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চাও আরও গভীর হয়। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছেও ঈদুল আজহা শুধুমাত্র আনন্দ উদযাপনের উপলক্ষ নয়; বরং এটি পরিবারে ফেরা, শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া এবং আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পাওয়ার একটি বিশেষ সময়।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যস্ততা, ক্লাস-পরীক্ষার চাপ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের মধ্যেও ঈদের ছুটি শিক্ষার্থীদের মনে এনে দেয় ভিন্নরকম স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, কোরবানির প্রস্তুতিতে অংশ নেওয়া, বন্ধু ও স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা; এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তারা নতুন করে উপলব্ধি করেন দায়িত্ববোধ, সামাজিক বন্ধন ও মানবিকতার গুরুত্ব। পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থী ঈদকে দেখেন আত্মশুদ্ধি, অন্যায় ও অহংকার থেকে দূরে থাকার শিক্ষা হিসেবেও। ঈদুল আজহাকে ঘিরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন নানা ভাবনা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন কুবি প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ।
“ঈদ মানেই বাড়ি ফেরার আনন্দ”
জেসমিন রেজা
বাংলা বিভাগ
প্রতি বছর ঈদ-উল-আযহা আমাদের জীবনে এক অনন্য আবেগ ও চিন্তার সংমিশ্রণ নিয়ে আসে। পরীক্ষার চাপ, ক্লাসের ব্যস্ততা আর হোস্টেলের একঘেয়েমি ছেড়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ যেন তাদের মনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। ঈদের দিনগুলোতে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ানো, বাসে-ট্রেনে গাদাগাদি করে বাড়ি ফেরা সবকিছুর মাঝেও মুখে ফুটে ওঠে অপার্থিব এক হাসি।কুরবানির এই ঈদ আমাদের কাছে শুধু উৎসব নয়, বরং ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির এক মহান দর্শন।ক্যাম্পাসে ফিরে এসে বন্ধুদের সঙ্গে কুরবানির মাংস ভাগাভাগি করা, গ্রামের দরিদ্র প্রতিবেশীদের মুখে হাসি ফোটানো এসব অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে সমাজসেবার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।”
”কোরবানি সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয় “
আশরাফুন্নেসা নেছা বীথি
গণিত বিভাগ
”ইদুল আজহা আমাদের ত্যাগ,আত্নশুদ্ধি ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়৷ আমার কাছে এটা শুধু আনন্দের উৎসব নয় বরং আত্মশুদ্ধির একটি অন্যতম সময়। পশু কুরবানির মাংস আত্নীয় স্বজন ও গরীবদের মধ্যে বিতরণের মধ্য দিয়ে সমাজে সমতা ও আন্তরিকতার এক অপূর্ব উদাহরণ সৃষ্টি হয়। প্রতিটি ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের মতো এই ঈদেও পরিবারের সবাই একত্রে আনন্দ উপভোগ করতে পারে, যা আমাদের মতো ঘর থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম প্রশান্তির বিষয়। আমি মনে করি,ইদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা যদি আমরা সারা বছর ধারন করি তাহলে সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য আরও বৃদ্ধি পাবে।”
“নিজের ভেতরের পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়ার শিক্ষা দেয় ঈদুল আজহা”
মো. সাইদুল ইসলাম
ইংরেজি বিভাগ
”ঈদুল আজহা শুধু পশু কোরবানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের ভেতরের হিংসা, লোভ ও অন্যায় প্রবণতাকে বিসর্জন দেওয়ারও শিক্ষা দেয়। মানুষ যদি আল্লাহভীতি ও নৈতিকতার চর্চা করতে পারে, তাহলে হত্যা, সহিংসতা, ছিনতাই কিংবা চাঁদাবাজির মতো অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে। এতে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ঈদের আনন্দ ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার ঘরে পৌঁছে যাবে।”
“কোরবানি হোক মনের পশুত্বের, ঈদ ছড়িয়ে দিক মানবিকতার বার্তা”
সাদিয়া জাহান প্রমি
ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ
”আনন্দ, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এক অপূর্ব মেলবন্ধন নিয়ে আসে ঈদ। সকল ব্যস্ততার উর্ধ্বে গিয়ে আত্মার সম্মিলনে প্রত্যেকের ঈদ হয়ে উঠে আরো প্রাণবন্ত আর আনন্দের। শুধু নতুন পোশাক বা উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতা, ত্যাগ ও মানবিকতা বোধ জাগিয়ে তুলতে ঈদ অনন্য। ঈদ সমাজের ধনী-গরিব সবাইকে যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়, আমার কাছে বরাবরই সেটি সবচেয়ে সৌন্দর্য্যের বিষয় বলে বিবেচিত হয়। বর্তমান ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে ঈদ মানুষকে আবারও সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করার সুযোগ এনে দেয়। তাই ঈদ আমাদের জীবনে শুধু উৎসব নয়, মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এই ঈদে কোরবানি হোক মনের পশুর। এই পৃথিবী নিরাপদ হোক শিশু ও নারীদের জন্য৷ সুবিচার পাক রামিসা সহ সকল ভিক্টিম’রা। ঈদ মুবারক।”






