বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে ফেসবুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই শিক্ষক ও তিন কর্মকর্তাকে মারধর, হেনস্তা, গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।
রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইবনে সিনা ভবন, প্রশাসন ভবন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ভবন, টিএসসিসি ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে এসব ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এ সময় ইবি শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন, আসাদ তৌফিক, সদস্য রেজাউল ইসলাম রাকিব, শাহরিয়ার রশিদ নিলয়, খালেদ সাইফুল্লাহ, আলীনূর রহমান, আব্দুল্লাহ আল নোমান, কর্মী উল্লাস মাহমুদ, মুফতিয়ান আহমেদ সাবিক, মোহাম্মদ সাগর আলী, নাঈম, রাহি হাসান, আতিকুর রহমান ও সেজানুর রহমান সেজানসহ ২৫-৩০ জন নেতা-কর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শহিদুল ইসলামের সঙ্গে বিভাগীয় সভাপতির কক্ষে এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমানের কক্ষে গিয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও গালিগালাজের অভিযোগ উঠেছে। তবে অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে কোনো হেনস্তা বা শারীরিক অসদাচরণ করা হয়নি।
শহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথাকাটাকাটির সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রতিবাদ জানালে তাদেরও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখার ড. ইব্রাহীম হোসেন সোনা এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের শাখা কর্মকর্তা টিটুল আহম্মেদের অফিসে গিয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। টিএসসির সহকারী রেজিস্ট্রার বিপুল আহমেদও তাঁকে মারধর এবং তাঁর টেবিল ও মগ ভাঙচুরের অভিযোগ করেছেন।
হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি অফিসে বসেছিলাম। এ সময় কিছু ছেলে এসে আমাকে বলে, “আপনি গতকাল শেখ মুজিবকে নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন, কাল থেকে আসবেন না।” এ সময় তারা আমাকে গালিগালাজ ও হুমকি-ধমকি দেয়। তারা চলে যাওয়ার সময় আমার ছাত্রদেরও মারধর করে। যেহেতু গতকাল ১৫ আগস্ট ছিল, তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। সেটি নিয়ে তারা কৈফিয়ত জানতে চেয়েছে।’
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তারা আমার রুমে এসেছিল। আমার গায়ে হাত তোলেনি। এমনকি আমি কোনো হেনস্তারও শিকার হইনি। এটা সত্য যে, তারা আমার রুমে বঙ্গবন্ধুর ছবি পেয়েছে। যেহেতু প্রক্টর এই বিভাগের, তাই এসব বিষয়ে তিনি ভালো জানেন।’
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের শাখা কর্মকর্তা টিটুল আহম্মেদ অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি প্রতিদিনের মতো কাজ করছিলাম। এ সময় ১০-১৫ জন এসে “শালা, তুই আওয়ামী লীগ করিস, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পোস্ট করিস, শোকের পোস্ট দিস”—এ ধরনের কথা বলে বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করে। বিভিন্নভাবে আমাকে মারতে আসে। আমাকে ক্যাম্পাসে আসতে নিষেধ করে। আমার টেবিলে থাকা প্লেট ভাঙচুর করে। তারা আমার কাছে অপরিচিত ছিল। পরে জানতে পারি, তারা ছাত্রদলের নেতা-কর্মী।’
প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখার ড. ইব্রাহীম হোসেন সোনা বলেন, ‘তারা আকস্মিকভাবে আমার রুমে আসে। এসে টেবিল ভাঙচুর করে। আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলাম। সে কারণেই হয়তো তারা এমনটি করেছে।’
টিএসসির সহকারী রেজিস্ট্রার বিপুল আহমেদ বলেন, ‘আমি অফিসে কাজ করছিলাম। এ সময় ২০ থেকে ২৫ জন এসে জিজ্ঞেস করে, “বিপুল কে?” এ সময় টেবিলে থাকা মগ দিয়ে টেবিলে আঘাত করে। এতে টেবিল ও মগ ভেঙে যায়। পরে তারা আমাকে গালিগালাজ ও মারধর করে।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাখা ছাত্রদলের নেতারা।
অভিযুক্ত শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাদ তৌফিক বলেন, ‘কোনো শিক্ষককেই শারীরিক বা মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়নি। মাহবুবের রুমে শেখ মুজিবের ছবি ছিল, আমরা তা অপসারণ করেছি। ১৫ আগস্ট উপলক্ষে তারা ক্যাম্পাসকে অশান্ত করার চেষ্টা করেছিল। ছাত্রদল সব সময় শান্ত ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণ চায়।’
শাখা ছাত্রদলের সদস্য শাহরিয়ার রশিদ নিলয় বলেন, ‘ফ্যাসিস্টদের ক্ষেত্রে কোনো আপস নেই। আমরা কোনো হামলা করিনি। ১৫ আগস্টকে উদ্দেশ্য করে তারা ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিয়েছে এবং তারা ক্যাম্পাসকে ঠিক থাকতে দিতে চায় না। তাই আমরা তাদের বলে এসেছি, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম যেন তারা ক্যাম্পাসে না করে। আমরা অন্য কারও নির্দেশে এই কাজ করিনি।’
শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, ‘কারও গায়ে হাত তোলা হয়নি, কোনো ভাঙচুরও করা হয়নি। মাহবুবের রুমে শেখ মুজিবের ছবি ছিল, সেটি সরানো হয়েছে। নিষিদ্ধ লীগের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স। যারা খালেদা জিয়াকে নিয়ে বাজে কথা বলবে, তাদের ছেড়ে দিয়ে কথা বলতে পারি না। তাদের নেতা নাকি ডিসেম্বরে আসবেন, সে জন্য তারা বিভিন্ন অপতৎপরতা চালাচ্ছে। শান্ত ক্যাম্পাসকে অশান্ত করার জন্য তারা যা ইচ্ছা তাই করবে। এত এত হত্যার পরও তাদের কোনো অনুশোচনাবোধ নেই। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘আজকে যেসব ঘটনা ঘটেছে, প্রক্টরিয়াল টিম সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে সেসব বিষয় সামাল দেওয়ার জন্য।’






