‘অনেক মানুষকে পাখির মতো মারা হয়। অনেক লাশ পড়ে থাকতে দেখি। গুলিতে প্রাণ হারায় আমার ১৪ বছর বয়সী ছেলে আমিকুল ইসলামও। তার কান ভেদ করে বেরিয়ে যায় গুলি।’ ছেলে হত্যার বিচার চাইতে এসে জবানবন্দিতে এসব কথা উল্লেখ করেন আরিশা আফরোজ।
বুধবার (১৩ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে আরিশার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় পঞ্চমতম সাক্ষী তিনি।
রাজধানীর বনশ্রীতে একটি মাদরাসায় নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল আশিকুল। মায়ের সঙ্গে থাকত একই এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শহীদ হয় সে।
জবানবন্দিতে আরিশা বলেন, ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। ওই দিন জুমার নামাজ শেষে আমার সঙ্গে খাবার খেয়েছিল আশিকুল। তখন বাইরে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনকারীদের আওয়াজ শুনে আমার ছেলেও অংশ নিয়েছিল। আমি তাকে এভিনিউ রোডে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হলে আশিকুলসহ আন্দোলনকারীরা দুই নম্বর রোডের দিকে চলে যায়।
ওই সময় কয়েকজনের গায়ে গুলি লাগতে দেখেন আরিশা। এর মধ্যে কারও হাতে, কারও পায়ে, আবার কারও মাথায় গুলি লেগেছিল। তাদের ক্ষতস্থানে কাপড় দিয়ে বেঁধে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন অন্য আন্দোলনকারীরা।
আশিকুলের মা বলেন, ওই দিন অনেক গোলাগুলি হয়েছিল। বহু মানুষকে পাখির মতো মারতে দেখেছি। অনেকের লাশ পড়েছিল। রাত গড়ালেও ছেলে না আসায় অপেক্ষা করতে থাকি। রাত ১০টার দিকে ৪ নম্বর হাউজের গ্যারেজে আশিকুলের জন্য হাঁটাহাঁটি করছিলাম।
এমন সময় একটি ছেলে আমাকে জিজ্ঞাস করে- আন্টি কি হয়েছে? আমি বলি- আমার ছেলে এখনও বাসায় ফেরেনি। ওর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। তখন ছেলেটি নিজের মোবাইলে একটি ছবি দেখিয়ে বলল- আন্টি দেখেন তো এটা আপনার ছেলে কি না। তখন মোবাইলে ছবিটি দেখেই চিনতে পারি যে, এটি আমার ছেলে। ছবিতে তার মাথায় ব্যান্ডেজ ও চোখ বন্ধ ছিল। ছবি দেখেই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।
তিনি বলেন, রাত ১২দিকে ছেলেকে দেখতে অ্যাডভান্স হাসপাতালে গেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে বলে জানান চিকিৎসকরা। আশিকুলের ডান কানের দিক দিয়ে গুলি ঢুকে বাম কান দিয়ে বেরিয়ে গেছে। রাতেই লাশ নিয়ে দিনাজপুরের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাই। পরদিন ২০ জুলাই তাকে দাফন করা হয়।
জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করা হয়, পরবর্তীতে জানতে পারি, শেখ হাসিনার নির্দেশে গুলি চালিয়েছেন কর্নেল রেদোয়ান, মেজর রাফাত, এডিসি রাশেদ ও মশিউর। আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ওবায়দুল কাদেরও জড়িত ছিলেন। আমি এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও আন্দোলনকারীদের মাধ্যমে জেনেছি। আমি নিজেও দেখেছি। আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।
এ মামলায় মোট আসামি চারজন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত বিন আলম।
পলাতকরা হলেন- ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান।
বার্তা বাজার/এমএমএইচ






