পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বিদেশি নাগরিকত্ব, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং তাদের নিয়োগ ও শপথ গ্রহণের সাংবিধানিক বৈধতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসলাম মিয়া এ আইনি নোটিশ পাঠান। নোটিশটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
আইনি নোটিশে বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬, ৬৬ ও ১৪৮ অনুচ্ছেদ এবং তৃতীয় তফসিলের আলোকে দুই মন্ত্রীর নাগরিকত্ব, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, সংসদ সদস্য হিসেবে যোগ্যতা এবং মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
নোটিশে আইনজীবী আসলাম মিয়া সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের বিধান তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের নাগরিক এবং ২৫ বছর বয়স পূর্ণ করেছেন এমন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য। তবে সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার বা স্বীকৃতি দিলে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া অথবা সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক অযোগ্যতার প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্বের ইতিহাস, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণের কোনো ঘটনা রয়েছে কি না, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের কোনো ঘোষণা বা শপথ দিয়েছেন কি না এবং বর্তমানে তার আইনগত নাগরিকত্বের অবস্থান কী এসব বিষয় সরকারি নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে সংবিধানের ৬৬(২এ) অনুচ্ছেদের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক কোনো ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে এবং পরবর্তীতে তা ত্যাগ করলে তার সাংবিধানিক অবস্থান সম্পর্কে বিশেষ বিধানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে দুই মন্ত্রীর ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্বের কোনো অতীত ইতিহাস থাকলে তা কখন গ্রহণ করা হয়েছিল, কখন ত্যাগ করা হয়েছে এবং বর্তমানে তাদের সাংবিধানিক ও আইনগত অবস্থান কী তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
আইনি নোটিশে মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তৃতীয় তফসিলে উল্লেখিত পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিকে দায়িত্ব গ্রহণের আগে নির্ধারিত শপথ বা ঘোষণা করতে হয়। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর শপথে বাংলাদেশের প্রতি সত্যিকার বিশ্বাস ও আনুগত্য এবং সংবিধান সংরক্ষণ, রক্ষা ও প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার করার বিষয় রয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, ড. খলিলুর রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তার ক্ষেত্রে তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক কি না, অতীতে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন কি না, বিদেশি পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা করেন কি না এবং কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ বা ঘোষণা দিয়েছেন কি না এসব বিষয় সরকারি পর্যায়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
একইভাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রেও তার বর্তমান নাগরিকত্বের অবস্থা, অতীতে কোনো বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণের তথ্য রয়েছে কি না, বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবহারের কোনো রেকর্ড আছে কি না এবং বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের কোনো ঘোষণা বা শপথের তথ্য রয়েছে কি না তা পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে।
আইনি নোটিশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই মন্ত্রীর নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট, অভিবাসন, জাতীয়তা, নাগরিকত্ব গ্রহণ ও ত্যাগসংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি এসব তথ্য যাচাইয়ের পর তাদের নিয়োগ ও দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬, ৬৬ ও ১৪৮ অনুচ্ছেদ এবং তৃতীয় তফসিলের বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যদি কোনো সাংবিধানিক অযোগ্যতা বা আইনগত অসঙ্গতি পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত আইন ও সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর কোনো অযোগ্যতা পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ এবং দায়িত্বে বহাল থাকার সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।
আইনি নোটিশ পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বাস্তবসম্মত ও আইনসম্মত জবাব দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আইনজীবী আসলাম মিয়া। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা না হলে অথবা উত্থাপিত সাংবিধানিক প্রশ্নের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনে বিদ্যমান প্রতিকার চেয়ে উপযুক্ত সাংবিধানিক বা বিচারিক ফোরামের শরণাপন্ন হওয়ার কথাও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আইনি নোটিশে স্পষ্ট করা হয়েছে, এটি কোনো চূড়ান্ত অভিযোগ, রায় বা সিদ্ধান্ত নয়। বরং দুই মন্ত্রীর নাগরিকত্ব, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করার উদ্দেশ্যেই নোটিশটি পাঠানো হয়েছে।






