ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

ভোটার তালিকা থেকে বাদ ৯০ লাখ মানুষ: ভারতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তোলপাড়

Authorরেডিও বার্তা ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৪ এএম

ভোটার তালিকা থেকে বাদ ৯০ লাখ মানুষ: ভারতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তোলপাড়

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক টেকনিশিয়ান মুহাম্মদ দাউদ আলি সম্প্রতি আবিষ্কার করলেন যে, তিনি আর তার নিজ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের ভোটার নন। নিজের পাসপোর্ট এবং চাকরির নথিপত্রসহ সব বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও ভোটার তালিকা থেকে তার এবং তার তিন সন্তানের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেবল তার স্ত্রীর নাম তালিকায় টিকে আছে।

৬৫ বছর বয়সী আলি এবং তার সন্তানেরা পশ্চিমবঙ্গের সেই ৯০ লাখ মানুষেরই একজন, যাদের নাম ২০২৬ সালের সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ১২ শতাংশই এখন ভোটাধিকার বঞ্চিত। এই পূর্ব ভারতীয় রাজ্যে নতুন সরকার নির্বাচনের জন্য চলতি মাসের শেষ দিকে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

অনিশ্চয়তার মুখে ২৭ লাখ ভোটার:

স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাদ পড়া এই ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৬০ লাখের বেশি নাম ‘অনুপস্থিত’ বা ‘মৃত’ ভোটার হিসেবে কাটা হয়েছে। তবে আলির পরিবারের মতো বাকি ২৭ লাখ ভোটারের ভাগ্য এখনও অমীমাংসিত। তাদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারের বিষয়টি এখন ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

ভারতের ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই বিশেষ সংস্কার প্রক্রিয়া চললেও পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য, যেখানে এর ওপর বাড়তি ‘বিশেষ বিচারিক’ স্তর যুক্ত করা হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভুয়া বা দ্বৈত এন্ট্রি বাদ দিয়ে একটি ‘নির্ভুল তালিকা’ তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। তবে গত বছর বিহার থেকে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়াটি প্রথম থেকেই আইনি চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কের মুখে পড়েছে।

রাজনৈতিক সংঘাত ও ‘অনুপ্রবেশ’ বিতর্ক:

পশ্চিমবঙ্গে এই বিতর্ক চরম আকার ধারণ করেছে, যেখানে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়েছেন, তাদের লক্ষ্য হল একটি ‘বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা’ নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো যোগ্য ভোটার বাদ পড়বে না এবং কোনো অযোগ্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হবে না।

তবে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য এই উত্তেজনাকে আরও উসকে দিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতারা নির্বাচনী প্রচারণায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই শুদ্ধি অভিযানের লক্ষ্য হল তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত করা।

তৃণমূলের দাবি, ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দটি মূলত মুসলিমদের লক্ষ্য করে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যক হিন্দু ভোটারও এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

ভৌগোলিক ও জনতাত্ত্বিক জটিলতা:

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ৪,০৯৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ ও অরক্ষিত সীমান্ত রয়েছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অভিবাসন এবং ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক এখানে সবসময়ই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য।

২০১১ সাল থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্য শাসন করছে এবং তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। লোকসভায় চতুর্থ সর্বোচ্চ আসন থাকা এই রাজ্যটি বিজেপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা তারা এখনও জিততে পারেনি।

এআই চালিত ছাঁটাই ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব:

তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে যে, বিজেপিকে সুবিধা দিতেই লাখ লাখ মানুষকে, বিশেষ করে মুসলিমদের, ভোটাধিকার বঞ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও তথ্য বলছে ভিন্ন কথা।

বিতর্কের মূলে রয়েছে সেই ২৭ লাখ ভোটার যাদের তথ্য এআই চালিত প্রক্রিয়ায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসামঞ্জস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এই অনিশ্চিত তালিকায় থাকা ভোটারদের প্রায় ৬৫ শতাংশই মুসলিম। সামগ্রিকভাবে বাদ পড়া ৯০ লাখ ভোটারের মধ্যে মুসলিমের সংখ্যা ৩১ লাখ ১০ হাজার (প্রায় ৩৪শতাংশ), যা রাজ্যে তাদের জনসংখ্যার অনুপাতের (২৭ শতাংশ) চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

আদালতের লড়াই ও সময়ের অভাব:

বারবার আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর পরও সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে এপ্রিলের ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার বিবাদ নিষ্পত্তি না হলেও ভোটগ্রহণ আটকে থাকবে না। ফলে ওই ২৭ লাখ ভোটারের ভাগ্য এখনও ঝুলে আছে।

আদালতের নির্দেশে গঠিত ট্রাইব্যুনালে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া টেকনিশিয়ান দাউদ আলি ও তার সন্তানদের আবেদন করতে হবে। কিন্তু ভোটার তালিকা ইতিমধ্যে ‘ফ্রিজ’ বা চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় এবং ২৩ ও ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারিত থাকায়, এই সময়ের মধ্যে ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা তারা দেখছেন না।

দাউদ আলি বিবিসি-কে বলেন, “আমি বাকরুদ্ধ। আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও অপমানিত বোধ করছি। আমাদের বিবাদ সমাধান না করে তারা কীভাবে নির্বাচন করতে পারে? আমি জানি না কার কাছে বিচার চাইব।”

গণতন্ত্রের জন্য ‘লজ্জা’:

এত বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ায় ভোটার নির্ধারণের মানদণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শিবাজী প্রতিম বসু বলেন, “ভারতে এমন কোনো নির্বাচনের নজির নেই যেখানে ভোটারদের অধিকার স্থগিত রেখে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ২৭ লাখ ভোটারকে বাইরে রাখা একটি অযৌক্তিক প্রস্তাব। এটি গণতন্ত্রের জন্য লজ্জা।”

তবে বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার একে জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী কেবল ভারতীয় নাগরিকরাই প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন করতে পারেন। তাই অ-নাগরিকদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”

শহর ও সীমান্ত জেলাগুলোতে গণ-ছাঁটাই:

ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব রাজ্যের সব জায়গায় সমান নয়। রাজধানী কলকাতায় উত্তর অংশে ২৯.৬% এবং দক্ষিণ অংশে ২৭.৫% ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ১৬.৯ শতাংশ ভোটার কমেছে, যাদের ৮০ শতাংশই হিন্দু।

বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলো, উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর এবং কোচবিহারেও ব্যাপক হারে ভোটারের নাম কাটা গেছে। উত্তর ২৪ পরগনাতেই ১২ লাখ ৬০ হাজার ভোটার (১৫ শতাংশ) বাদ পড়েছেন। ভারতের সবচেয়ে বেশি মুসলিম অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদে ৭ লাখ ৪৯ হাজার (১৩ শতাংশ) ভোটারের নাম কাটা গেছে।

নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান বিষয়:

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় অন্য সব বিষয় ছাপিয়ে এই ভোটার তালিকার বিষয়টিই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনী জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, “২৭ লাখ ভোটারের সমস্যার সমাধান না করে নির্বাচন শুরু হয় কীভাবে?”

‘লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস’-এর নৃবিজ্ঞানী মুকুলিকা ব্যানার্জি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের এই ছাঁটাইয়ের ধরন দেখে মনে হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীকে ‘সিলেক্টভলি টার্গেট’ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে তাদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।”

মালদা জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা হরিশচন্দ্রপুরের ৩৫ বছর বয়সী হাসনারা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার বাবা-দাদা সবাই এ দেশের ভোটার ছিলেন। এখন আমাদের পরিবারের ৭ জনের মধ্যে ৫ জনেরই ভোটাধিকার নেই। আমাদের কার্যত ‘অ-নাগরিক’ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পদ্ধতিকে আর বিশ্বাস করা যায় না। আইনি লড়াই চলবে, কিন্তু আমরা প্রতিবাদও থামাব না।”

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!