দক্ষিণ লেবাননে একটি সামরিক যান উলটে যাওয়ার ঘটনায় দখলদার ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) এক রিজার্ভ সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন। একই সময়ে হিজবুল্লাহর সঙ্গে পৃথক সংঘর্ষে আহত হয়েছেন আরও ১০ জন সেনা। সোমবার এ তথ্য জানায় আইডিএফ।
টাইমস অব ইসরাইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত সেনার নাম সার্জেন্ট মেজর (রিজার্ভ) আয়াল ইউরিয়েল বিয়ানকো (৩০)। তিনি ১৮৮তম সাঁজোয়া ব্রিগেডে ফায়ার ট্রাক চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং কাটসরিন এলাকার বাসিন্দা। রোববার রাতে দক্ষিণ লেবাননে একটি হামভি যান উলটে গেলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
একই ঘটনায় আহত তিন রিজার্ভ সেনার মধ্যে একজনের অবস্থা মাঝারি এবং দুজন সামান্য আহত হন। তাদের চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করছে সামরিক কর্তৃপক্ষ। কাটসরিনের মেয়র ইয়েহুদা দুয়া সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘আয়াল সব সময় দায়িত্বশীল ছিলেন। ডাকা হলে তিনি কখনোই পিছিয়ে থাকতেন না। দেশের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতেন’।
অন্যদিকে, দক্ষিণ লেবাননের বিন্ত জেবেইল শহরে হিজবুল্লাহর তিন বন্দুকধারীর সঙ্গে সংঘর্ষে আইডিএফের প্যারাট্রুপার ব্রিগেডের ১০১তম ব্যাটালিয়নের ১০ জন সেনা আহত হন। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর, একজন মাঝারি এবং ছয়জন সামান্য আহত বলে জানায় আইডিএফ।
সামরিক বাহিনীর দাবি, পালটা গুলি, ট্যাংকের গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর দুই সদস্য নিহত হয়। পরে পালানোর চেষ্টা করলে তৃতীয় সদস্যকেও শনাক্ত করে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়।
রোববার একই এলাকায় আরেক ঘটনায় হিজবুল্লাহর এলিট রাদওয়ান ফোর্সের এক সদস্যসহ তিনজন আইডিএফ সেনাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইসরাইলে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে মঙ্গলবার আইডিএফ জানায়, দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযানের সময় ৪০১তম সাঁজোয়া ব্রিগেডের ৫২তম ব্যাটালিয়নের একজন কমান্ডার গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে হিজবুল্লাহ মঙ্গলবারও ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে রকেট ও ড্রোন হামলা চালায়। কয়েকটি সীমান্তবর্তী এলাকায় সাইরেন বাজলেও হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
আইডিএফ জানায়, রোববার রাতে দক্ষিণ লেবাননের আদশিত শহরে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকায় সংগঠনটির তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় এ হামলা চালানো হয় বলে জানানো হয়।
সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে আদশিত এলাকা থেকে প্রায় ১৩০টি রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই কিরিয়াত শমোনা লক্ষ্য করে। হামলায় অস্ত্রভাণ্ডার, রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং হিজবুল্লাহর ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এছাড়া গত এক দিনে দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ১৫০টি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বুধবারের পর থেকে বৈরুতে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো হামলা চালায়নি আইডিএফ। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং ইরানের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষাপটে ই কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের হিজবুল্লাহর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বিন্ত জেবেইল শহর ঘিরে অভিযান চালাচ্ছে আইডিএফ এবং শহরটি প্রায় দখলের পথে বলে জানানো হয়েছে।
২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধে এ শহরটি দখল করতে ব্যর্থ হয়েছিল আইডিএফ। এর আগে ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহারের পর হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ এখানেই বিজয় ভাষণ দেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনা ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরান চাইছে লেবাননকেও যুদ্ধবিরতির আওতায় আনা হোক, তবে এ বিষয়ে ইসরায়েল অনড় অবস্থানে রয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে ইসরাইলি হামলায় দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে আইডিএফের দাবি, একই সময়ে এক হাজার চারশোর বেশি হিজবুল্লাহ সদস্য নিহত হয়েছে।
এ পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননে সংঘর্ষে ১৩ জন আইডিএফ সেনা নিহত হয়েছে। হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় দুজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ইসরাইলি গোলাবর্ষণে ভুলবশত একজন নাগরিক নিহত হয়েছে। আইডিএফ জানায়, লেবাননে এখন পর্যন্ত তিন হাজার পাঁচশোর বেশি হিজবুল্লাহ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে শত শত কমান্ড সেন্টার, অস্ত্রভাণ্ডার এবং রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র রয়েছে।
বার্তা বাজার/এস এইচ





