যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই একটি অত্যন্ত সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান। হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধকে পাশ কাটিয়ে ইরানে পণ্য পরিবহনের জন্য ছয়টি স্থলপথ বা ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ উন্মুক্ত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ইসলামাবাদ। এই পদক্ষেপ কেবল ইরানের ওপর মার্কিন চাপকে শিথিল করবে না, বরং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক রুটগুলোকেও নতুন করে আঁকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত ২৫ এপ্রিল পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘ট্রানজিট অব গুডস থ্রু টেরিটরি অব পাকিস্তান অর্ডার ২০২৬’ শিরোনামে একটি বিশেষ গেজেট (এসআরও) প্রকাশ করেছে। এই আদেশের মাধ্যমে গদর, করাচি ও পোর্ট কাসিম বন্দরকে ইরানের গাব্দ এবং তাফতান সীমান্ত পারাপারের সঙ্গে সংযুক্ত করে ছয়টি ট্রানজিট রুট নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আদেশের ফলে এখন থেকে ‘তৃতীয় দেশের কার্গো’ পাকিস্তানি বন্দর ব্যবহার করে সরাসরি সড়কপথে ইরানে প্রবেশ করতে পারবে। এর ফলে চীন বা অন্য বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো সমুদ্রপথের মার্কিন তল্লাশি ও অবরোধ এড়িয়ে ইরানের বাজারে পণ্য পাঠাতে সক্ষম হবে।
কেন এই আকস্মিক ও হিসাবি ঝুঁকি?
গত ১৩ এপ্রিল থেকে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবরোধ আরোপ করে, যার ফলে করাচি বন্দরে ইরানের উদ্দেশ্যে আসা প্রায় ৩ হাজার কন্টেইনার আটকা পড়ে। পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে ২০০৮ সালে একটি দ্বিপক্ষীয় সড়ক পরিবহন চুক্তি সই হলেও তা রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে এতদিন অব্যবহৃত ছিল। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজেদের আটকা পড়া বাণিজ্যের চাকা সচল করতে এবং ইরানের অনুরোধে ইসলামাবাদ এই পুরোনো চুক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে।
পাকিস্তানের এই ল্যান্ড ব্রিজ চালুর ফলে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ধাক্কা খেয়েছে ভারত। গত দুই দশক ধরে ভারত ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করেছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে এড়িয়ে সরাসরি ইরান, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশ করা।
তবে বর্তমান মার্কিন অবরোধ চাবাহার বন্দরকেও অচল করে দিয়েছে। এর ফলে ভারতের কৌশলগত বিনিয়োগ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। অন্যদিকে, চাবাহার থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পাকিস্তানের চীন-ঘনিষ্ঠ গদর বন্দর এখন ইরানের জন্য প্রধান বিকল্প বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। এটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব কমিয়ে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিতে পারে।
ওয়াশিংটনের রহস্যময় নীরবতা ও ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
এই সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পাকিস্তান ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা করেনি। তবে অবাক করার মতো বিষয় হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ল্যান্ড ব্রিজ সম্পর্কে অবগত থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো কড়া পদক্ষেপ নেননি। ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি এ সম্পর্কে সবকিছু জানি।’ কিন্তু পাকিস্তানের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তানের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে ট্রাম্পের সুসম্পর্ক অথবা আফগান সংকট নিরসনে পাকিস্তানের সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশাই হয়তো ওয়াশিংটনকে আপাতত নমনীয় রেখেছে।
অবশ্য ইসলামাবাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত মূলত টিকে থাকার লড়াই। চলতি বছরের শুরুতে আফগানিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ থাকায় পাকিস্তানের জন্য মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ায় পৌঁছানোর একমাত্র পথ এখন ইরান। পাকিস্তান যদি এই ঝুঁকি না নিত, তবে তাদের রপ্তানি বাণিজ্য আকাশপথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ত, যা অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব।
তবে এই ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনি ও ব্যাংকিং জটিলতা প্রকট। কোনো ব্যাংক যদি এই বাণিজ্যে অর্থায়ন করে এবং তা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে, তবে পাকিস্তানের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া পণ্যের অন্তরালে কোনো নিষিদ্ধ সামগ্রী পাচার হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাও পাকিস্তানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
পাকিস্তানের এই ঝুঁকিগ্রহণ সফল হলে তা ইরানকে মার্কিন অবরোধের মধ্যে শ্বাস ফেলার সুযোগ করে দেবে। একই সঙ্গে এটি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরকে (সিপিইসি) আরও শক্তিশালী করবে। তবে ওয়াশিংটন যদি ভবিষ্যতে তার অবস্থান পরিবর্তন করে কঠোর হয়, তবে পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি এক ভয়াবহ সংকটে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তথ্যসূত্র: দ্য ন্যাশনাল, এএফপি ও তাসনিম নিউজ এজেন্সি
বার্তা বাজার/এস এইচ






