ভবিষ্যতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনও ‘দুঃসাহসিক পদক্ষেপ’ নিলে শত্রুপক্ষকে ‘অত্যন্ত বিস্তৃত, বিপজ্জনক, সুদূরপ্রসারী ও বেদনাদায়ক’ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। এমনই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ভারত-পাকিস্তানের গত বছরের সংঘাতের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, ওই যুদ্ধে পাকিস্তান শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও তথ্যযুদ্ধেও সফল হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য ডন বলছে, রোববার (১০ মে) রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদরদপ্তর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে (জিএইচকিউ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আসিম মুনির এ কথা বলেন। গত বছর ভারতের সঙ্গে সংঘাতের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মূলত ২২ এপ্রিল পেহেলগাম হামলা থেকে শুরু করে পাকিস্তানের ‘অপারেশন বুনইয়ানুম মারসুস’ এবং ১০ মে যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া ভারত-পাকিস্তান সংঘাতকে পাকিস্তান সরকার ‘মারকা-ই-হক’ বা ‘সত্যের যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আসিম মুনির। এছাড়া বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিধু এবং নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরাফও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ফিল্ড মার্শাল মুনির বলেন, ‘আমাদের শত্রুদের জানা উচিত, ভবিষ্যতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনও দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নেয়া হলে যুদ্ধের প্রভাব সীমিত থাকবে না; বরং তা হবে অত্যন্ত বিস্তৃত, বিপজ্জনক, সুদূরপ্রসারী ও বেদনাদায়ক।’
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি দিনটিকে পাকিস্তান, জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘গর্বের উৎস’ বলে উল্লেখ করেন। আসিম মুনির বলেন, ৬ ও ৭ মে রাত থেকে ১০ মে পর্যন্ত পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড লঙ্ঘনের মাধ্যমে ‘শত্রুপক্ষ পাকিস্তানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করার ব্যর্থ চেষ্টা’ করেছিল। তবে পাকিস্তান পূর্ণ জাতীয় ঐক্য ও সামরিক শক্তি দিয়ে তার জবাব দিয়েছে।
মুনির বলেন, ‘মারকা-ই-হক শুধু দুই দেশ বা দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রচলিত যুদ্ধ ছিল না। বাস্তবে এটি ছিল দুই মতাদর্শের মধ্যে একটি চূড়ান্ত লড়াই, যেখানে আল্লাহর রহমতে সত্যের জয় হয়েছে এবং মিথ্যার পরাজয় হয়েছে’। সত্য ও মিথ্যা নিয়ে কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের মে মাসের সংঘাত কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল ভারতের মিথ্যা ও বিস্তৃত শোষণমূলক কৌশলের অংশ।
তিনি বলেন, ‘২০০১, ২০০৮, ২০১৬ ও ২০১৯ সালের ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশনগুলো প্রমাণ করে, ভারত অতীতেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ, অতিরঞ্জন, যুদ্ধোন্মাদনা ও সীমিত আগ্রাসনের বিভ্রান্তিকর ধারণা ব্যবহার করে অবৈধ যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে।’
পাকিস্তানের এই সেনাপ্রধান বলেন, প্রতিবারই পাকিস্তান ভারতের ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে এবং চূড়ান্ত পরাজয় উপহার দিয়েছে। আসিম মুনির বলেন, ‘এই যুদ্ধেও ভারত আবারও তার পুরোনো ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক চিন্তার শিকার হয়েছে’। তিনি বলেন, অপারেশন বুনইয়ানুম মারসুসের উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সেই আচরণকে উন্মোচন করা, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা আড়াল করতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উন্মাদনা সৃষ্টি করে।
তার মতে, ভারত ভেবেছিল সামরিক আগ্রাসন ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে পাকিস্তানকে দুর্বল করে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারবে। কিন্তু বিশ্বের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা জানেন, ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের সক্ষমতা ও বাস্তবিক অবস্থানের চেয়ে অনেক বড় ছিল। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী কখনও শক্তির আধিপত্যে ভয় পায়নি এবং ভবিষ্যতেও পাবে না।
ভারতের হামলায় নিহত নারী, শিশু ও বয়স্কদেরসহ ‘মারকা-ই-হক’-এর শহিদদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি। মুনির বলেন, ‘মারকা-ই-হকের সব শহীদ ও তাদের পরিবার আমাদের মাথার মুকুট। তাদের আত্মত্যাগই আমাদের স্বাধীনতার গ্যারান্টি’। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শহিদদের আমানত, শক্তি ও দায়িত্ব হিসেবে দেখি এবং আমাদের সাফল্যকে আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করি।’
এ সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, ফেডারেল মন্ত্রিসভা, জাতীয় ও প্রাদেশিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সব রাজনৈতিক দলকে ধন্যবাদ জানান তিনি। তার ভাষায়, তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও নেতৃত্ব পাকিস্তানের সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, ‘জাতীয় নেতৃত্ব, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও পাকিস্তানের জনগণ এক কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছে— দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় মর্যাদার সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না।’
মুনির আরও দাবি করেন, পাকিস্তান কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও সফল হয়েছে এবং দেশটির নেতারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি গণমাধ্যম, সাংবাদিক সমাজ এবং বিশেষ করে তরুণরা যেভাবে শত্রুপক্ষের প্রচারণা, সাইবার যুদ্ধ ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যর্থ করে দিয়েছে, তার কোনও তুলনা নেই’। তার মতে, এই সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে জেতা হয়েছে।
জাতীয় ঐক্য ও দেশপ্রেমকে দেশের প্রকৃত শক্তি উল্লেখ করে তিনি পাকিস্তানি জনগণের সমন্বিত জাতীয় ঐক্যের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘যখন যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল, তখন শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ ও তরুণ— সব পাকিস্তানি নারী-পুরুষ নিজেদের পরিচয় ভুলে শুধু পাকিস্তানকে রক্ষার সংকল্প নিয়েছিল’। তার ভাষায়, ‘জাতি, সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে এমন সম্পর্ক আমরা দেখেছি, যার ফলে পুরো জাতি লোহার দেয়ালের মতো দেশের প্রতিরক্ষায় দাঁড়িয়ে যায়।’
এরপর তিনি কোরআনের সেই আয়াত পাঠ করেন, যেখান থেকে পাকিস্তানের পাল্টা অভিযানের নাম ‘বুনইয়ানুম মারসুস’ নেয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনী শুধু আগ্রাসী শত্রুকে পরাজিত করেনি, বরং স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর পেশাদার দক্ষতা এবং উচ্চমানের সামরিক কৌশল শত্রুকে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য করেছে।’
বিমানবাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, বিমানবাহিনী শত্রুর অহংকার ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে এবং আধুনিক যুগের ‘সবচেয়ে দীর্ঘ ও নির্ণায়ক আকাশযুদ্ধের’ উদাহরণ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের একাধিক আধুনিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে এবং বহু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে।
নৌবাহিনীর ভূমিকাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, পাকিস্তানি নৌবাহিনী সমুদ্রসীমায় সতর্ক নজরদারির মাধ্যমে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজকে পাকিস্তানের উপকূল থেকে হাজার মাইল দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া ওয়ার্কিং বর্ডার ও নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলওসি) থাকা বাহিনীগুলোর প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারা ভারতের আগ্রাসন প্রতিহত করেছে এবং শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা অবস্থানে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে।
পাকিস্তানের এই সেনাপ্রধান বলেন, ভারত বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং এর মূল্য ভবিষ্যতেও দিতে হবে। তিনি বলেন, সংঘাতের সময় পাকিস্তান ভারতে ২৬টির বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সফল হামলা চালায়। এরপর নয়াদিল্লি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে যুদ্ধবিরতির ইচ্ছা প্রকাশ করে। মুনির বলেন, ‘পরাজিত ভারত মার্কিন নেতৃত্বের মাধ্যমে মধ্যস্থতার অনুরোধ জানায় এবং আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে পাকিস্তান সেটা গ্রহণ করে।’
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান বলেন, বিদেশি আগ্রাসনের মুখে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ অজেয়। তিনি বলেন, ‘আমরা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও কার্যকর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’। তার মতে, সশস্ত্র বাহিনীর মূল লক্ষ্য আগ্রাসন নয়, শান্তি রক্ষা। তবে তিনি বলেন, ‘শান্তি বজায় রাখতে সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা বাধ্যতামূলক।’
মুনিরের মতে, প্রচলিত যুদ্ধের যুগ শেষ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে ‘মাল্টি-ডোমেইন অপারেশন’-নির্ভর, যেখানে সাইবার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, ড্রোন, দূরপাল্লার অস্ত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি জানান, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীকে এই নতুন ধরনের যুদ্ধে আরও সমন্বিত করতে ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স গঠন করা হয়েছে, মহাকাশ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে এবং আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড গঠন করা হয়েছে।
এছাড়া পাকিস্তান নৌবাহিনীতে হাঙর শ্রেণির সাবমেরিন যুক্ত করা, বিমানবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ এবং ফাতাহ ক্ষেপণাস্ত্র সিরিজকে এই আধুনিকায়নের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি শুধু নতুন অস্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে নতুন চিন্তাভাবনা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণাও জড়িত।
বার্তা বাজার/এমএমএইচ






