ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি গবাদিপশু ব্যবসা ও দুগ্ধ খাত এখন খাদের কিনারায়। কেন্দ্রে ও বিভিন্ন রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র নেতৃত্বাধীন সরকারের কট্টর গো-নীতি এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সাঁড়াশী চাপে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে হাজার কোটি টাকার এই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার। একদিকে সীমান্ত পারাপারে কড়াকড়ির কারণে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে গরু পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ‘গো-রক্ষক’ নামধারী দলগুলোর সহিংস তাণ্ডব এবং পরিবহনে কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা—এই দুই ফ্রন্টের মারমুখী অবস্থানে ভারতীয় ডেইরি খামারি, কৃষক ও চামড়া ব্যবসায়ীরা এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন।
গত এক দশক ধরে সীমান্ত সুরক্ষায় বিজেপির কট্টর অবস্থান এবং বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর নজিরবিহীন নজরদারির কারণে ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু পাঠানো কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। অতীতে ভারতের উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও রাজস্থান থেকে উদ্বৃত্ত ও অনুৎপাদক (দুষণহীন বা বুড়ো) গরু পশ্চিমবঙ্গ এবং আসাম সীমান্ত হয়ে আইনি ও অনানুষ্ঠানিক পথে বাংলাদেশে আসত। এটি ছিল ভারতীয় কৃষকদের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সুরক্ষাকবচ। বুড়ো গরু বিক্রি করে যে নগদ অর্থ আসত, তা দিয়ে তারা নতুন দুগ্ধবতী গাভী কিনতেন। বাংলাদেশে গরুর এই বিশাল বাজারটি রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন রাজ্যগুলোর গবাদিপশুর হাটগুলো এখন সম্পূর্ণ ক্রেতাশূন্য ও দেউলিয়া হওয়ার পথে।
সংকট কেবল সীমান্তে নয়, ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারগুলোও এখন অবরুদ্ধ। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে পাস হওয়া কঠোর গো-সুরক্ষা আইনের আড়ালে তৈরি হয়েছে এক ভয়ংকর ভীতি ও সহিংসতার পরিবেশ।
বৈধ লাইসেন্স ও কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে বা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পশুবাহী ট্রাক চলাচলের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। মহাসড়কগুলোতে সক্রিয় রয়েছে উগ্র ‘গো-রক্ষক’ বাহিনী। গবাদিপশু পরিবহনের সামান্যতম সূত্র পেলেই ট্রাক ভাঙচুর, চালক ও ব্যবসায়ীদের ওপর সহিংস হামলা, এমনকি পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে।
পুলিশের পরোক্ষ মদদ ও আইনি জটিলতার ভয়ে সাধারণ পরিবহন কর্মীরা এখন পশুবাহী গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে হরিয়ানা বা পাঞ্জাবের উন্নত জাতের দুগ্ধবতী গাভী দক্ষিণ বা পূর্ব ভারতের খামারিদের কাছে পৌঁছানোর স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চেইনটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
অর্থনীতির সাধারণ নিয়মকে উপেক্ষা করে ধর্মের আবেগে তৈরি এই নীতি এখন খোদ সনাতন ধর্মাবলম্বী কৃষকদের জন্যই মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি গাভী যখন দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন তার পেছনে প্রতিদিন অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ টাকা খরচ করা ভারতের প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে অসম্ভব। বিক্রি বা পরিবহনের পথ বন্ধ হওয়ায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে রাতের অন্ধকারে এই অনুৎপাদক গরু ও পুরুষ বাছুরগুলোকে রাস্তা বা বনে ছেড়ে দিচ্ছেন।
এর ফলে উত্তর ও মধ্য ভারতের রাজ্যগুলোতে লাখ লাখ ‘বেওয়ারিশ গরু’ বা ‘আওয়ারা পশু’র সৃষ্টি হয়েছে। এই ক্ষুধার্ত গরুর দল এখন কৃষকদের বিঘার পর বিঘা ফসলের মাঠ সাবাড় করছে। ফসল বাঁচাতে কনকনে শীতেও কৃষকদের লাঠি হাতে রাত জেগে মাঠ পাহারা দিতে হচ্ছে। এছাড়া এই বেওয়ারিশ পশুগুলো মহাসড়কগুলোতে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে বিজেপির এই নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ভারতের গবাদিপশু ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত দেশটির চামড়া ও মাংস উৎপাদন শিল্প। গো-রক্ষকদের তাণ্ডব এবং কাঁচামালের (পশুর চামড়া ও হাড়) তীব্র সংকটের কারণে উত্তরপ্রদেশের কানপুর এবং পশ্চিমবঙ্গের বড় বড় ট্যানারি ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ প্রান্তিক মানুষ, যাদের একটি বড় অংশ দলিত ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। বিশ্ববাজারে ভারতের অন্যতম শীর্ষ আয়কারী এই রপ্তানি খাতটি এখন তীব্র মন্দার কবলে।
ব্যবসায়িক ও জীবননাশের ঝুঁকি এড়াতে ভারতের ডেইরি খামারি এবং কৃষকেরা এখন দ্রুত গরু পালন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ভারত সরকারের নিজস্ব পশুসম্পদ শুমারি অনুযায়ী, দেশজুড়ে দেশীয় বা আদি জাতের গরুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এর বিপরীতে কৃষকেরা এখন মহিষ, ছাগল ও ভেড়া পালনে ঝুঁকছেন। কারণ, মহিষের ক্ষেত্রে কোনো আইনি জটিলতা বা গো-রক্ষকদের হামলার ভয় নেই। মহিষের দুধের দামও বেশি এবং দুধ দেওয়া বন্ধ করলে তা কোনো রাজনৈতিক ঝামেলা ছাড়াই বাজারে বিক্রি করে দেওয়া যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক সমীকরণকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ধর্মীয় মেরুকরণ ও রাজনৈতিক ফায়দা লোটার নীতি যে শেষ পর্যন্ত নিজের দেশের অর্থনীতিকেই ধ্বংস করে, ভারতের বর্তমান গবাদিপশু ব্যবস্থার এই মরণদশা তারই জীবন্ত প্রমাণ। ধর্মের নামে গরুকে ‘মা’ বা ‘দেবতা’র আসনে বসালেও, বিজেপির এই কট্টর নীতি আজ লাখ লাখ গরুকে রাস্তায় ক্ষুধার্ত অবস্থায় মরতে এবং কোটি কোটি কৃষককে দেউলিয়া হতে বাধ্য করেছে।
বার্তা বাজার/এমএমএইচ






