ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো দ্রুত পুনরায় সচল হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া একাধিক ঘাঁটির প্রবেশপথ ও সড়ক মেরামত করেছে তেহরান। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের মার্কিন কৌশল কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, ইরান বুলডোজার, ডাম্প ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুলে ফেলছে। একই সঙ্গে বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কও দ্রুত সংস্কার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সুড়ঙ্গের মুখ ধ্বংস করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থায়ীভাবে অকার্যকর করা সম্ভব নয়। কারণ, দেশটির বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র এখনও গভীর ভূগর্ভে নিরাপদে সংরক্ষিত রয়েছে।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর নন-প্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ থাকলেও ইরানের হাতে এখনও বিপুল মজুত রয়েছে। যতদিন উৎক্ষেপণযন্ত্র ও প্রশিক্ষিত কর্মী থাকবে, ততদিন তারা হামলা চালাতে সক্ষম হবে।’
যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির প্রবেশপথ ধ্বংস করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সীমিত করার চেষ্টা করে। এতে ইরানের হামলার গতি কমে গেলেও তা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধবিরতির পর গত সাত সপ্তাহে ঘাঁটিগুলো পুনরুদ্ধারের কাজ আরও দ্রুত গতিতে এগিয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে ইসফাহানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে দেখা গেছে, একাধিক প্রবেশপথ পুনরায় খুলে দেয়া হয়েছে এবং ধ্বংস হওয়া সড়ক নতুন করে পাকা করা হয়েছে। খোমেইন এলাকার আরেকটি ঘাঁটিতে অন্তত ১০টি নির্মাণযান একযোগে পুনরুদ্ধার কাজে অংশ নিতে দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের কাছে এখনো প্রায় এক হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। গভীর ভূগর্ভে সংরক্ষিত থাকায় এসব ক্ষেপণাস্ত্রের অধিকাংশই বিমান হামলার ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে।
যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও ইরান অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো খনন করার কাজ করেছিল, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায়শই খননকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলোতে হামলা চালাত। এই কাজের ফলেই তেহরান যুদ্ধজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ চালিয়ে যেতে পেরেছিল।
হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর পিস রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি পলিসির গবেষক তিমুর কাদিশেভ বলেন, ‘ইরান প্রায় ২০ বছর ধরে এমন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং প্রস্তুত।’
অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর দাবি করছে যে ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হানা হয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তেহরান ইতিমধ্যে ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠনের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ইরান গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসের সময়সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল অস্ত্র দিয়ে যে ক্ষতি করা হয়েছে, তা মেরামতে ইরান তুলনামূলক সহজ ও স্বল্পব্যয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ফলে ভবিষ্যতে সংঘাত পুনরায় শুরু হলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি আগের চেয়ে দ্রুত ফিরে আসতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।






