যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি হয়তো বন্দুকের গুলি থামাবে, কিন্তু তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের ফলে যে নতুন বাস্তবতা গড়ে উঠেছে তা বদলাতে পারবে না। উপসাগরীয় সূত্র, কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চল কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকটের একটি থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু শক্তির ভারসাম্য মোটামুটি অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। বরং ইরান আগের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা আস্থায় গভীর ফাটল ধরেছে।
তাঁদের মতে, ইরান এখন একটি শক্তিশালী ও অপরাজিত শক্তি। দেশটি বরং এখন আগের তুলনায় প্রমাণিতভাবে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহকে হুমকির মুখে ফেলতে সক্ষম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আবারও দেখিয়েছে, একটি স্থিতিস্থাপক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা কতটা বাস্তব।
ওয়াশিংটনের জন্য এই চুক্তি এক ধরনের প্রস্থানপথ। একটি ব্যয়বহুল সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ, যা তাদের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা এবং ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ভেঙে ফেলা।
ইরানের জন্য এই চুক্তির তাৎপর্য আরও গভীর—এটি টিকে থাকার প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবিরাম হামলার চাপ সহ্য করার পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, রাজনৈতিক কাঠামো ধরে রেখেছে এবং আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা মূল লিভারেজের বড় অংশও বজায় রেখেছে। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অপারেশন ‘এপিক ফিউরি আসলে এক মহাবিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে।’
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় ধাক্কা
আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ৬০ দিনের জন্য শত্রুতা স্থগিত থাকবে। এই সময় দুই পক্ষ স্থায়ী সমঝোতার জন্য আলোচনা করবে, যার মধ্যে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের বিরোধও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি অনুভূত হচ্ছে সুন্নি আরব উপসাগরীয় দেশগুলোতে। দশকের পর দশক ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি যে স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা এখন গভীরভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে। এই হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে তারাই সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ, তারা এমন সিদ্ধান্তের দর্শক, যা তাদের নিরাপত্তা কাঠামোকে বদলে দিয়েছে এবং এখন তাদেরই সেই পরিণতি বহন করতে হচ্ছে।
উপসাগরীয় সূত্রগুলো বলছে, এই চুক্তি ইতোমধ্যেই তাদের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে, ইরানকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা বাড়ছে এবং সংঘাতের বদলে সমঝোতার দিকে ঝোঁক বাড়ছে। এক জ্যেষ্ঠ উপসাগরীয় সরকারি সূত্র সরাসরি বলেন, ‘উত্তেজনা প্রশমন অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু বাস্তবতা হলো যুদ্ধের আগের অবস্থার তুলনায় পরিস্থিতি এখন নিঃসন্দেহে আরও খারাপ।’
পূর্বসূরিরা এড়িয়ে যেতেন, সেই ঝুঁকিগুলোই কেন নিচ্ছে বর্তমান ইরান সরকারপূর্বসূরিরা এড়িয়ে যেতেন, সেই ঝুঁকিগুলোই কেন নিচ্ছে বর্তমান ইরান সরকার
প্রস্তাবিত চুক্তিটি ইসরায়েলের জন্যও অনুকূল নয় বলে মনে করছেন তিন ইসরায়েলি কর্মকর্তা। তাঁদের মতে, এতে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতা ভেঙে ফেলা এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধের মতো মূল দাবি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাঁরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত বলে ইঙ্গিত দেওয়ার পর ইসরায়েল বিষয়টি নিয়ে বিস্মিত হয়। এতে আলোচনার শর্ত নির্ধারণে তাদের প্রভাব সীমিত হয়ে পড়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিষয়টি সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেন বলে তাঁর কার্যালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, ইসরায়েল এই চুক্তির অংশ নয় এবং চূড়ান্ত চুক্তির জন্য তাদের শর্ত হলো—ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অবসান।
কট্টর-ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইসরায়েল ‘কোনোভাবেই’ এটি মানতে বাধ্য নয়।
উপসাগরীয় রাজধানীগুলোর তেহরানমুখী ঝোঁক
উপসাগরীয় সূত্রগুলোর মতে, এই চুক্তি সংঘাতের একটি পর্যায় হয়তো শেষ করবে, কিন্তু এটি সেই কৌশলগত দ্বন্দ্বের সমাধান করে না যা এই যুদ্ধ উন্মোচন করেছে। ইরান এখনো শক্তিশালী পক্ষ, হরমুজ প্রণালী আবারও চাপ প্রয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং উপসাগরীয় অর্থনীতির ভিত্তিগত ধারণাগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভঙ্গুর হয়ে উঠছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল অভিযানের ফল হয়েছে ঠিক সেইসব আশঙ্কা, যা তারা দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিল। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যা অর্থনীতিতে বড় আঘাত হেনেছে। উপসাগরীয় রাজধানীগুলো যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও অনেকেই এখন এক কঠিন বাস্তবতায় পৌঁছাচ্ছে—ইরানের চ্যালেঞ্জকে না যুক্তরাষ্ট্র, না ইসরায়েল কেউই পুরোপুরি সরাতে পারেনি। বরং এর খরচ বহন করতে হয়েছে মাঝখানে আটকে পড়া দেশগুলোকে।
মধ্যপ্রাচ্য গবেষক ফাওয়াজ গারগাশ বলেন, ‘আরও বেশি উপসাগরীয় দেশ বুঝতে পারছে, ইরান এখানেই থাকবে, তারা কোথাও যাচ্ছে না এবং আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার সক্ষমতা তার আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে বিশ্বাস করে না। তারা আশা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র শাসন পরিবর্তন ঘটাবে। কিন্তু উল্টোটা ঘটেছে।’ তাঁর ভাষায়, ‘এখন উপসাগরীয় শাসকরা বুঝতে পারছে, নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতার জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের ওপর নির্ভর করতে পারে না।’
ইরানসহ আঞ্চলিক জোটই কি ইসরায়েলকে ঠেকানোর একমাত্র পথইরানসহ আঞ্চলিক জোটই কি ইসরায়েলকে ঠেকানোর একমাত্র পথ
এই পুনর্মূল্যায়ন একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ইরানকে অবিশ্বাস করলেও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ওপর নির্ভর করে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিল। এখন তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় রাজধানীগুলো ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাতের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের আগে আঞ্চলিক মূল প্রশ্ন ছিল আরব–ইসরায়েল স্বাভাবিকীকরণের পরিধি। গারগাশ বলেন, ‘যুদ্ধের পর এখন ফোকাস সরে যাচ্ছে উপসাগরীয়–ইরান সমঝোতার দিকে।’ ওয়াশিংটন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে থাকলেও বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত ধীরে ধীরে কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এক পুনর্বিন্যাসকে ত্বরান্বিত করবে—যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করবে এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা খুঁজবে।
ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ব্যর্থ
সৌদি বিশ্লেষক আবদুলআজিজ সাগর আরও স্পষ্ট। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন তাদের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে—শাসন পরিবর্তন থেকে শুরু করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত। বরং ইরান নতুন দুটি কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে—হরমুজকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সক্ষমতা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা।
গাজা গণহত্যা: বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, ইসরায়েলের ৮০ বছরের পরিকল্পনার ফসলগাজা গণহত্যা: বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, ইসরায়েলের ৮০ বছরের পরিকল্পনার ফসল
তিনি বলেন, ‘তারা (আমেরিকানরা) শর্তহীন আত্মসমর্পণ থেকে সমঝোতায় এসেছে। তারা পিছিয়ে গেছে।’ তিনি যোগ করেন, ‘তারা বলেছিল ইরানি শাসন পরিবর্তন করবে—পারেনি। তারা বলেছিল ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক ইস্যু সমাধান করবে—সেটাও হয়নি।’
বিশ্লেষকদের মতে, যা স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে তা কোনো শান্তিচুক্তি নয়; বরং যুদ্ধ থামানোর একটি কাঠামো মাত্র। মূল বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত—ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, সমৃদ্ধকরণের মাত্রা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ।
অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, এই সমঝোতা স্মারক কোনো সমাধান নয়, বরং ‘আলোচনার টিকিট।’ একটি প্রাথমিক ধাপ যা সময় ও জায়গা তৈরি করে দেয় এমন আলোচনার জন্য, যার সফলতা নিশ্চিত নয়। এর কাঠামো গাজা যুদ্ধবিরতির মতোই—কঠিন প্রশ্নগুলোকে পিছিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু সমাধানের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। তিনি বলেন, ‘যা স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে তা শান্তি নয়, বরং একটি স্বীকৃতি—যুদ্ধের লক্ষ্য তার অর্জনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল; যুদ্ধক্ষেত্রে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আরও অনিশ্চিত নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নিজেদের পুনর্গঠন করছে।’
৪৭ বছরের বৈরিতা: অবশেষে যেভাবে চুক্তিতে পৌঁছাল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে কারা৪৭ বছরের বৈরিতা: অবশেষে যেভাবে চুক্তিতে পৌঁছাল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে কারা
মিলারের মতে, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বাহ্যিক সামরিক চাপ—দুইই সহ্য করার পর ইরান এখন নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি—এই যুদ্ধ কি তার স্থিতিস্থাপকতাকে দুর্বল করেছে, নাকি আরও শক্তিশালী করেছে—যার প্রভাব ভবিষ্যতের প্রতিরোধ ও শক্তির ভারসাম্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিফলিত হবে।
বার্তা বাজার/এস এইচ






