অনেক দেশেই রেড অ্যালার্ট জারি, ভয়ংকর ‘এল নিনোর’ হানা, নিহত ১০০০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভয়ংকর ‘এল নিনো’র আবির্ভাব ঘটেছে পৃথিবীতে। এরই মধ্যে আবহাওয়ার চরম এ পরিস্থিতির প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ইউরোপের জনজীবন। নজিরহীন তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে একের পর এক দেশ। অনেক দেশেই জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট। শুধুমাত্র ফ্রান্সেই তাপদাহে ১ হাজার মানুষের প্রাণহানির তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) দেশটির জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থার এক পরিসংখ্যানে এই তথ্য জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি জানায়, তাপদাহের কারণে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক অসুস্থতায় আরও অনেকে মারা গেছেন; যারা পরিসংখ্যানের বাইরে রয়েছেন। যে কারণে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সংস্থাটি আরও জানায়, ২৪ জুন থেকে এ পর্যন্ত আগের মাসগুলোর একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ছিলেন।
সংস্থাটি বলেছে, একাকী ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষের সুরক্ষায় আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তবে প্রকাশিত মৃত্যুর তথ্য এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে তারা। গত কয়েকদিন ধরে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলেও রোববার কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।
একইসঙ্গে স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আল্পস পর্বতমালা পর্যন্ত বহু দেশে তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে বলে জানিয়েছে এএফপি ও রয়টার্স।
কয়েক মাসের নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর চলতি মাসের শুরুতে একটি ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)। তাদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষরেখায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি শুরু হয়েছে। অনেক আবহাওয়াবিদ সতর্ক করেছেন, এবারের এল নিনো গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ নিতে পারে।
গণমাধ্যমগুলো একে ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবেও আখ্যা দিচ্ছে। তবে এটি কোনো বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়।
এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শনিবার নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড গড়েছে। জার্মানি, ডেনমার্ক ও চেক প্রজাতন্ত্রে সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার প্রাথমিক রেকর্ড তৈরি হয়েছে, আর সুইজারল্যান্ডে ভেঙেছে জুন মাসের রেকর্ড। এর আগে সপ্তাহজুড়ে ফ্রান্স ও ব্রিটেনেও নতুন রেকর্ড গড়ে।
জার্মান আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের ময়েকার্ন-ড্রেভিৎস এলাকায় শনিবার ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা দেশটির নতুন সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। ডেনমার্কে ১৮৭৪ সালের পর সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্রে তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৪০ দশমিক ৯ ডিগ্রিতে, আর স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভায় ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ রাত পার হয়েছে।
জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ছাড়া এমন তীব্র তাপদাহ প্রায় অসম্ভব। তাদের মতে, বর্তমানে রাতের অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা দুই দশক আগের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেড়েছে।
জার্মানির গ্রিন পার্টির সাবেক সংসদীয় নেতা ক্যাটরিন গ্যোরিং-একহার্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এটি আর মনোরম গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট।
তাপদাহের কারণে ইউরোপজুড়ে নানামুখী প্রভাব পড়েছে। জার্মানিতে দেশজুড়ে তাপমাত্রা নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। হাঙ্গেরিতে দানিয়ুব নদীর পানি অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে যাওয়ায় পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি রিঅ্যাক্টরের উৎপাদন কমানো হয়েছে। একই কারণে সুইজারল্যান্ডের বেজনাউ পারমাণবিক কেন্দ্রও সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
ইতালিতে মিলান, রোম, তুরিন, ভেনিস, জেনোয়া, ফ্লোরেন্স ও বোলোনিয়াসহ ১৮টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। দেশটির প্রধান নদী পো-তে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভেতরের দিকে প্রবেশ করছে, যা কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করেছে।
অতিরিক্ত তাপের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সড়ক ও রেল যোগাযোগেও বিঘ্ন ঘটছে। জার্মানির অন্যতম ব্যস্ত একটি মহাসড়কে তাপের কারণে ফাটল দেখা দেওয়ায় আংশিক বন্ধ রাখা হয়েছে। ডয়চে বান যাত্রীদের দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিট পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছে। একইভাবে কয়েকটি দেশে বড় জনসমাগম ও ক্রীড়া আয়োজনের সময়সূচি পরিবর্তন কিংবা প্রতিযোগিতার দূরত্ব কমিয়ে আনা হয়েছে।
অত্যধিক গরমে হামবুর্গের কাছে জার্মানির অন্যতম ব্যস্ত একটি মহাসড়কের একটি লেনে ফাটল দেখা যাওয়ায় আংশিক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সুইজারল্যান্ডে লোজান প্রাইড শোভাযাত্রায় অতিরিক্ত পানির ব্যবস্থা ও জরুরি সেবাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। মিলানে প্রাইড মিছিলের সময় পিছিয়ে বিকেল ৫টায় নেওয়া হয়। আর ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিতব্য আয়রনম্যান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তীব্র গরমের কারণে সাইক্লিং ও দৌড়ের দূরত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, গ্রিক বর্ণ ওমেগার আকৃতির মতো একটি উচ্চচাপ বলয় বা ‘ওমেগা ব্লক’ সৃষ্টি হওয়ায় বিশাল গরম বাতাস দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপের ওপর আটকে রয়েছে। এর ফলেই মৌসুমের স্বাভাবিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি তাপমাত্রা দেখা দিচ্ছে।
তবে সপ্তাহান্তের পর চরম তাপদাহ ধীরে ধীরে কমতে পারে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রসহ ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ, এল নিনো (স্প্যানিশ শব্দটির অর্থ ছোট ছেলে) প্রাকৃতিক জলবায়ুর একটি চক্র। পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়তে পারে।
২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া আগের এল নিনো পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রার রেকর্ড গড়েছিল। অনেক গণমাধ্যম ইউরোপের বর্তমান দাবদাহের জন্য এল নিনোকে দায়ী করা হচ্ছে।






