যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হচ্ছে। দেশটির কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো দৃশ্যমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ‘নীরব অভ্যুত্থান’ ঘটানোর অভিযোগ তুলেছে। একই সময়ে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে না আসায় এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে তেহরানে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় এই উত্তেজনা প্রকাশ্যে আসে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কফিনের পাশে হাঁটার সময় শোকাহতদের একাংশ আলী খামেনিকে শ্রদ্ধা জানানোর পরিবর্তে ‘সমঝোতাকারীর মৃত্যু হোক’ বলে স্লোগান দেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের চুক্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও সমালোচনার মুখে পড়েন। বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে শোকাহতদের একাংশ তার দিকে পাথর ছুড়ে মারলে তাকে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে হয়।
সিএনএন বলছে, ইরানের কট্টরপন্থিদের মধ্যে এমন ধারণা জোরালো হচ্ছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করা শীর্ষ কর্মকর্তারা দেশটির বিপ্লবী নেতৃত্বকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করছেন। এদিকে নিরাপত্তাজনিত কারণে আলী খামেনির উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে খুব কমই উপস্থিত হয়েছেন। সমালোচকদের কেউ কেউ তার দীর্ঘ অনুপস্থিতিকে স্বাস্থ্যগত কারণের সঙ্গে যুক্ত করলেও এ বিষয়ে কোনও সরকারি নিশ্চিতকরণ নেই।
যেকোনও আগ্রাসনের জবাব হবে বিধ্বংসী, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের হুঁশিয়ারিযেকোনও আগ্রাসনের জবাব হবে বিধ্বংসী, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের হুঁশিয়ারি
কট্টরপন্থিদের দাবি, ইসরায়েলের হামলায় আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার এমন একটি চুক্তিতে সই করেছে, যা মোজতবা খামেনির নির্দেশনার পরিপন্থি। যদিও সরকার তার নামেই রাষ্ট্র পরিচালনা ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা এখনও জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেননি বা প্রকাশ্যে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি।
মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতিতে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুদ্ধ-পরবর্তী প্রশাসনের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। কট্টরপন্থিদের অভিযোগ, তারা পার্লামেন্টকে পাশ কাটিয়ে, আলোচনায় সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা উপেক্ষা করে এবং কট্টরপন্থিদের রাতের বিক্ষোভ দমন করে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করছেন।
আলী খামেনির জানাজার কয়েক দিন আগে রক্ষণশীল সংসদ সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ান এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ইরানের জনগণকে সতর্ক করছি, অভ্যুত্থান কি আসন্ন? জানাজার পর তিনি বলেন, সমর্থকেরা খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধের পতাকা উড়াবেন এবং কথিত অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইরান বিশেষজ্ঞ ও ‘হোয়াট ইরানিয়ানস ওয়ান্ট’ বইয়ের লেখক আরাশ আজিজি সিএনএনকে বলেন, মোজতবা খামেনির দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে কট্টরপন্থিরা নতুন সর্বোচ্চ নেতার কাছে সরাসরি পৌঁছাতে পারছেন না। ফলে তারা গালিবাফ ও পেজেশকিয়ানকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের মূল কারিগর হিসেবে তুলে ধরছেন।
কে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিশোধের দাবি জোরালো করার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে কট্টরপন্থিরা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততারও বিরোধিতা করেন তারা। সপ্তাহজুড়ে নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর এই অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলা চালায়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা চালানোর পর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি বাতিলের দাবিও নতুন করে ওঠে।
দীর্ঘদিন বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও গালিবাফও কট্টর সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, তিনি পার্লামেন্ট ও সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা খর্ব করে জাতীয় নিরাপত্তা সর্বোচ্চ পরিষদের ক্ষমতা বাড়াচ্ছেন।
অভ্যন্তরীণ এই দ্বন্দ্ব পার্লামেন্টেও ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার নাবাভিয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিরোধী আরেক সংসদ সদস্যকে জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একসময় ইরানের আলোচক দলের সদস্য থাকা নাবাভিয়ান পরে চুক্তির অন্যতম কড়া সমালোচকে পরিণত হন। অভিযোগ রয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই তিনি এর বিষয়বস্তু ফাঁস করে আলোচনাকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা করেছিলেন এবং আলোচকদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ নেতার নির্ধারিত ‘লাল রেখা’ লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান নেতৃত্ব ধীরে ধীরে কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে।
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি সিএনএনকে বলেন, গালিবাফ কট্টরপন্থিদের ক্ষমতা সীমিত রাখতে প্রভাব খাটাচ্ছেন। ইরানের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের দ্বন্দ্বও প্রকাশ্যে নিয়ে আসছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যমান এই দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার মতো কৌশলগত বিষয়ে ইরানের বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামো এখনও ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে মোজতবা খামেনির দীর্ঘ অনুপস্থিতি, যুদ্ধবিরতিতে তার শর্তসাপেক্ষ সমর্থন, বিপ্লবী গার্ডের বাড়তি ভূমিকা এবং আলী খামেনির জানাজায় ব্যাপক জনসমাগম- এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের দাবিতে কট্টরপন্থিদের অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে।
এই অবস্থানের প্রতিফলন ঘটিয়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানুচেহর মোত্তাকি বুধবার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের উচিত এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে মার্কিন সেনাদের আটক করা। তার ভাষায়, ১০০ জন সেনাকে ধরে ইরানে নিয়ে আসতে পারলেই যথেষ্ট হবে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
বার্তাবাজার/এসআইপি






