ঢাকা   সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

নেপালে নিখোঁজ ৪ হাজারেরও বেশি, সুড়ঙ্গের ৯৩৩ জনকে উদ্ধারে মরিয়া চেষ্টা

Authorরেডিও বার্তা ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম

নেপালে নিখোঁজ ৪ হাজারেরও বেশি, সুড়ঙ্গের ৯৩৩ জনকে উদ্ধারে মরিয়া চেষ্টা

বাইরে ধ্বংসস্তূপের পাহাড়, ভেতরে অন্ধকার সুড়ঙ্গ। তার মাঝেই বেঁচে থাকা মানুষদের খুঁজে পেতে চলছে মরিয়া চেষ্টা। নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর প্রায় ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ এলাকায় আটকা পড়া ৯০০ জনেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা।

সোমবার দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে নিখোঁজ ৯৩৩ জনকে খুঁজে বের করাই এখন উদ্ধার অভিযানের প্রধান লক্ষ্য।
গত বুধবার নেপালের বিভিন্ন উপত্যকায় পাহাড় থেকে নেমে আসে বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নজিরবিহীন স্রোত। মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। ভয়াবহ ওই দুর্যোগে নেপালে মৃতের সংখ্যা এখন ৯০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তের তিব্বত অংশে আরও ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

নেপালে এখনো ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বতে নিখোঁজের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে।

প্রচণ্ড স্রোতে পাহাড় থেকে ভেসে আসা শত শত মৃতদেহ এখন হিমালয় অঞ্চলের সমভূমিতে অগভীর কবরে চাপা দেওয়া হয়েছে। নিহতদের অনেকের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে নিখোঁজদের একটি বড় অংশের সন্ধান মিলতে পারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায়। তাই উদ্ধারকারী দলগুলোর প্রধান মনোযোগ এখন ওই এলাকাগুলোতে।

উদ্ধারকারী দলগুলোর প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে জমে থাকা মাটি ও ধ্বংসাবশেষ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও আবার উদ্ধারকারীরা কোদাল হাতে কাদার স্তর সরিয়ে ভেতরে ঢোকার পথ তৈরি করছেন।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেট বলেন, সুড়ঙ্গগুলোর ভেতরে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে আছে। আর সেটিই সুড়ঙ্গ খুলে উদ্ধারকারীদের ভেতরে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া আশিস গুরুং সাধারণত একজন গাইড হিসেবে কাজ করেন। ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনিও উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে সুড়ঙ্গে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, ‘সবখানে শুধু কাদা। টানেলের ভেতরে অবস্থা আরও খারাপ ছিল। নড়াচড়া করা খুব কঠিন, কাদা অনেক গভীর।’রোববার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রুসওয়ানার চিলিমে একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রবেশের চেষ্টা করছিল তার দল।

গুরুং জানান, সুড়ঙ্গে ঢোকার আগে পর্বতারোহীরা কাঠের তক্তা ব্যবহার করে কাদার গভীরতা পরীক্ষা করেন। পরে সেই তক্তাগুলোকে অস্থায়ী সেতু হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তারা দড়ির একটি ব্যবস্থাও তৈরি করেন, যাতে বিপজ্জনক কাদা ও পানির মধ্য দিয়ে এগোনোর সময় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যায়।

তিনি বলেন, সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে হাঁটা অত্যন্ত কঠিন ছিল। একপর্যায়ে পানি তাদের বুক পর্যন্ত উঠে আসে।

গুরুং বলেন, ‘আমরা প্রথম স্টেশনের কাছাকাছি, প্রায় ১৩০ মিটার ভেতরে পৌঁছেছিলাম। অতটা ভেতরে আরও দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল; মনে হচ্ছিল শুধু লাশ পড়ে আছে।’

তবে ভয়াবহ সেই দৃশ্যের মধ্যেও উদ্ধারকারীরা জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা ছাড়ছেন না।জলবিদ্যুৎ সংস্থাটি উদ্ধারকারী দলকে সুড়ঙ্গের একটি মানচিত্র দিয়েছিল। সেটি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, সুড়ঙ্গের ভেতরের অবকাঠামোর কিছু অংশে মানুষ নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারেন।

গুরুং বলেন, ‘ভেতরে তাদের একটি নিরাপদ জায়গা আছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো বেঁচে আছেন। আমি আশা করছি তারা বেঁচে আছেন।’

রেড ক্রসের অনুমান, এই ভয়াবহ দুর্যোগে ৯০ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। চীন এবং কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এই দুর্যোগকে জলবায়ু সংকটের প্রভাবের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ এই বন্যাকে একটি ‘অভূতপূর্ব ও বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, বন্যায় প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং অবকাঠামো ধ্বংসের পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করা এখনো অত্যন্ত কঠিন।

রোববার গভীর রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম ভূখণ্ড এবং চলমান ঝুঁকি সত্ত্বেও, আমরা আমাদের নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি প্রায় ২১ হাজার নিরাপত্তা কর্মী উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা সোমবার জানিয়েছে, দেশটিতে ৯০৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২৪৭ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক।

অন্যদিকে, রবিবার পর্যন্ত চীনা কর্তৃপক্ষ তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪৬ জন।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতে নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে শতাধিক নেপালি রয়েছেন।

দুর্যোগ মোকাবিলায় চীনও বড় আকারের উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, বেইজিং ২ হাজার ১০০ জনেরও বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য কমপক্ষে ২২০ মিলিয়ন ইউয়ান বা ৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।

চীন আকাশপথে সম্মুখসারির উদ্ধারকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও রসদ পাঠাচ্ছে। পাশাপাশি চীনা সেনারা নিখোঁজদের সন্ধানে জীবন শনাক্ত করার বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন।

নেপাল জানিয়েছে, সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে তাদের বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে সুড়ঙ্গের মতো জটিল স্থানে উদ্ধারকাজ পরিচালনার দক্ষতার জন্য তারা প্রতিবেশী ভারত ও চীনের ওপর নির্ভর করেছে।

নতুন বন্যার আশঙ্কায় বারবার থমকে যাচ্ছে অভিযান
উদ্ধার অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম ভূখণ্ড। এই দুর্যোগের ফলে নেপাল-চীন সীমান্তে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে ওই হ্রদ উপচে পড়লে পানি নেপালের নদীগুলোতে গিয়ে নতুন করে বন্যা সৃষ্টি করতে পারে-এমন আশঙ্কা রয়েছে।

এই ঝুঁকির কারণে শুক্রবার থেকে উদ্ধার অভিযান বেশ কয়েকবার স্থগিত করা হয়েছে।

তবে সোমবার আবহাওয়া তুলনামূলক ভালো থাকায় উদ্ধারকাজ আবারও গতি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দুটি জেলার একটি রাসুয়ার জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার।

এদিকে বন্যায় বিধ্বস্ত ত্রিশূলী নদীর তীরে অবস্থিত পবিত্র শহর দেবীঘাটে এখন চারদিকে শুধু ধ্বংসের চিহ্ন। যেখানে একসময় ছিল মানুষের ঘরবাড়ি, সেখানে এখন পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ।

সেই ধ্বংসস্তূপের চারপাশে ঘুরছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কেউ খুঁজছেন স্বজনের কোনো চিহ্ন, কেউবা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিজেদের ঘর থেকে বেঁচে থাকা সামান্য জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। ভয়াবহ বন্যার পর দেবীঘাটসহ পুরো অঞ্চলে এখন একই সঙ্গে চলছে নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষা, ধ্বংসস্তূপ সরানোর লড়াই এবং নতুন করে বন্যা আসার আতঙ্ক।
প্রতিবেদন: দ্য গার্ডিয়ান

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন