ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে—জামায়াতে ইসলামীর এক সংসদ সদস্যের এমন মন্তব্যের জেরে বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। বিএনপি দলীয় এক সংসদ সদস্যের আপত্তির মুখে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ওই বক্তব্যকে আপত্তিকর আখ্যা দিয়ে সংসদের কার্যবিবরণী থেকে তা এক্সপাঞ্জ (বাদ দেওয়া) করার নির্দেশ দেন। তবে এরপরও সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে কয়েক দফা বিতর্ক চলে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মেহেরপুর-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দিন খান এই প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। তিনি বলেন, বাজেটে ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা হিসাব করলে প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে মাত্র ৯০টি পরিবার এই সুবিধা পাবে। বাকি দরিদ্র পরিবারের কী হবে, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি অভিযোগ করেন, কার্ড পাওয়ার এই প্রতিযোগিতাকে পুঁজি করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের খবর উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে এবং টাকাও আদায় করা হচ্ছে।
তাজউদ্দিন খানের এই বক্তব্যের পরপরই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তীব্র আপত্তি জানান নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এম মাহবুবউদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, ‘সংসদে এভাবে কথা বলা উচিত নয়। সংসদে কোন ভাষা ব্যবহার করতে হবে, তা জানতে হবে।’ তিনি অবিলম্বে ‘ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে ধর্ষণ’ কথাটি সংসদের রেকর্ড থেকে এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকারের আসনে থাকা কায়সার কামাল বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করার ঘোষণা দেন।
ডেপুটি স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের হুইপ রফিকুল ইসলাম খান। তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, কোনো বক্তব্য তখনই এক্সপাঞ্জ করা যায় যখন তা অসত্য বা অসংসদীয় হয়।
এরপর আবার ফ্লোর নেন তাজউদ্দিন খান। নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বিস্তারিত তথ্য ও পুলিশের উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল ফরিদপুরের সোনাগাজী থানায় ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা হয়েছে। ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনার প্রাথমিক সত্যতাও নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া গত ২৫ এপ্রিল রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ভাঙা ইউনিয়ন পরিষদের বিএনপির এক সহ-সম্পাদককে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে একই অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল।
এ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ফ্যামিলি কার্ড শুধু প্রধানমন্ত্রীর বা বর্তমান সরকারের বিষয় নয়, এটি সারা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে একটি আশার জায়গা।
মাগরিবের নামাজের বিরতির পর অধিবেশন আবার শুরু হলে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিষয়টি আবারও উত্থাপন করেন জামায়াতের হুইপ রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, যে ঘটনাটি পত্রপত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যার জেরে একটি দলের নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং অন্য জায়গায় মামলা ও গ্রেপ্তার হয়েছে, তা কোনোভাবেই অসত্য হতে পারে না। তিনি দাবি করেন, তাজউদ্দিন খান ফ্যামিলি কার্ড বা সরকারের কোনো উদ্যোগের সমালোচনা করেননি, বরং এই কার্ডকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যে অপকর্ম করা হচ্ছে, তা তুলে ধরেছেন। তাই এটি এক্সপাঞ্জ হওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়।
এর জবাবে ডেপুটি স্পিকার রফিকুল ইসলাম খানকে আস্বস্ত করে বলেন, তাজউদ্দিন খান পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট মামলা, স্থান ও তথ্যসূত্র উল্লেখ করে যেসব কথা বলেছেন, তা সংসদের রেকর্ডে বহাল থাকবে। এ সময় সরকারি দলের বেঞ্চ থেকে কয়েকজন সংসদ সদস্য আপত্তি জানালেও ডেপুটি স্পিকার রুলিং দিয়ে জানান যে, বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।






