এলাকার উন্নয়ন কাজের তদারকি বা সমন্বয়ের দায়িত্ব সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের (এমপি) দেওয়ার উদ্যোগকে ‘অসাংবিধানিক ও বেআইনি’ দাবি করে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ৬৭ নির্বাচিত সংসদ সদস্য। জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে লেখা এক চিঠিতে ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ সংশোধনের উদ্যোগ প্রত্যাহারের অনুরোধও জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন তার ফেসবুক পেজে স্পিকারের কাছে পাঠানো চিঠিটি প্রকাশ করেন। বিষয়টির সমাধান হবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
এর আগে গত ২০ আগস্ট স্পিকারের কাছে ওই চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে সই করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও ঢাকা-১৫ আসনের এমপি শফিকুর রহমান, নীলফামারী-১ আসনের আব্দুস সাত্তার, নীলফামারী-২ আসনের আলফারুক আব্দুল লতিফ, নীলফামারী-৩ আসনের ওবায়দুল্লাহ সালাফী প্রমুখ।
এ ব্যাপারে ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ জয়নুল আবেদীন বলেন, এ বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে বক্তব্য দেবেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকার সম্প্রতি সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের সাধারণ সংসদীয় এলাকায় উন্নয়ন কাজের তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে আইন সংশোধনের খসড়া তৈরি করেছে। তবে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ের আলোকে এ উদ্যোগ সাংবিধানিক ও আইনি নীতির পরিপন্থি।
সংসদ সদস্যদের চিঠিতে সংবিধানের ৬৫(২), ৬৫(৩), ১২১ ও ১২৪ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেন, প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ৩০০ আসনের বিপরীতেই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা ও ভোটার তালিকা রয়েছে। অন্যদিকে, সংরক্ষিত ৫০ নারী আসনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং এসব আসনের নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক এলাকা নেই।
এতে বলা হয়, সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীসংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়ে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের নির্বাচন ও দায়িত্বের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা বা সীমানা নির্ধারণের সম্পর্ক নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংসদ সদস্যদের দাবি, সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। এ অবস্থায় সংরক্ষিত আসনের এমপিদের সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের এলাকায় উন্নয়ন তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হলে একই এলাকায় ‘দ্বৈত শাসন’ তৈরি হবে। এটি ‘কুদরত-ই-ইলাহী পনীর বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায় এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি বলেও চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।
চিঠিতে ভারত, পাকিস্তান, তানজানিয়া, উগান্ডা, কেনিয়া, নিউজিল্যান্ড ও রুয়ান্ডার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের দাবি, এসব দেশের কোথাও সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত এমপিদের নির্বাচনী এলাকা তদারকি বা সমন্বয়ের আইনি কর্তৃত্ব দেওয়া হয়নি।
আইন সংশোধনের প্রস্তাব
আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ সংশোধন করে নতুন ২৬ক ধারা যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে তাদের সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের এক বা একাধিক সাধারণ আসনে উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব দিতে পারবে। এ বিষয়ে স্পিকারকে অবহিত করতে হবে।
সম্প্রতি সরকার সংরক্ষিত নারী এমপিদের বিভিন্ন সাধারণ সংসদীয় এলাকায় উন্নয়ন কাজ তদারকির দায়িত্ব দিয়েছে। এরই মধ্যে তারা বিভিন্ন সংসদীয় আসন পরিদর্শন ও সফর করেছেন। এতে মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিতর্কও দেখা দিয়েছে।
বিরোধী দলের এমপিরা এর আগের অধিবেশনেও বিষয়টি নিয়ে সংসদে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ, সংরক্ষিত আসনের এমপিদের এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের স্বাধীন দায়িত্ব পালনে হস্তক্ষেপের শামিল। এতে ক্ষমতার বিভাজন ব্যবস্থাও দুর্বল হবে বলে মনে করেন তারা।






