প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি
এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : চট্টগ্রামের আদালতে বিচারাধীন বিভিন্ন মামলায় সাক্ষ্য দিতে না আসায় প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একাধিক দাপ্তরিক চিঠি পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সিএমপির উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ১৮টি পৃথক স্মারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের নির্ধারিত তারিখে সকাল ৯টায় আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বলা হয়।
জানা গেছে, আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য এসব পুলিশ সদস্যকে একাধিকবার সমন ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অনেকে হাজির হননি। ফলে বছরের পর বছর ধরে বিচারাধীন থাকা অনেক মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ আটকে আছে।
সিএমপির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের বিরুদ্ধে এর আগে একাধিকবার সমন, গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং সর্বশেষ জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও তারা আদালতে হাজির হননি। তাদের অনুপস্থিতিকে মামলাগুলো নিষ্পত্তির অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাক্ষীদের মধ্যে কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ সদস্য রয়েছেন। তাদের কেউ বর্তমানে চট্টগ্রামে কর্মরত, আবার কেউ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ কেউ সিআইডি, পিবিআই, নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও এসবির মতো বিশেষায়িত ইউনিটেও কর্মরত।
যেসব থানার মামলায় সাক্ষী পুলিশ
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, খুলশী, সদরঘাট, হালিশহর, চকবাজার, কর্ণফুলী, ডবলমুরিং, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, আকবরশাহ, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী ও ইপিজেড থানার মামলাও রয়েছে।
এসব মামলা চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চ, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ আদালত ও শিশু আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন।
২০২২ সালের হত্যা মামলাও আটকে
গুরুতর অপরাধের মামলাতেও পুলিশ সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে বিচারকাজে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তৃতীয় আদালত একটি হত্যা মামলায় পুলিশ কমিশনারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
আদালতের আদেশে বলা হয়, ২০২২ সালে দায়ের করা ওই মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর বাদীসহ অন্যান্য সাক্ষীকে আদালতে হাজির করার জন্য বারবার প্রসেস ইস্যু করা হলেও রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষীদের হাজির করতে পারেনি। এতে পুরোনো মামলাটির বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আওয়ামী লীগের ২ নেতা ও ৬ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
আগামী ১৮ নভেম্বর সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কমিশনার, সিএমপি বরাবর আদেশের অনুলিপি পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। নির্ধারিত তারিখে সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১(২) ধারার আলোকে মামলায় কোনো বিরূপ ফল হলে এর দায় পুলিশ কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়।
জটিলতা বাড়ছে বদলিতে
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বা ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা পরবর্তী সময়ে অন্য জেলা কিংবা ইউনিটে বদলি হয়ে যাওয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
আদালত থেকে পাঠানো সমন অনেক সময় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের পুরোনো কর্মস্থলে পৌঁছায়। পরে তা রিজার্ভ অফিস, সিএমপি দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ইউনিট হয়ে নতুন কর্মস্থলে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে। আবার সমন পৌঁছালেও নির্ধারিত তারিখে আদালতে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামের কয়েকজন বেঞ্চ সহকারী জানান, পুলিশ সাক্ষীদের বিরুদ্ধে সমন ও পরোয়ানা জারি অনেক ক্ষেত্রে আদালতে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ার অংশ। পরে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য আদালতে হাজির হলে অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাওয়া হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলায় সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
নোয়াখালীতেও ১২১ পুলিশ সাক্ষীকে হাজিরের নির্দেশ
নোয়াখালীর পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে জেলার বিভিন্ন থানা ও ইউনিটে পাঠানো এক চিঠিতে ১২১ জন পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বিচারাধীন মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার তারিখ নির্ধারিত থাকলেও কিছু পুলিশ সদস্য আদালতে অনুপস্থিত থাকছেন। এতে বিচারপ্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব হচ্ছে। নির্ধারিত তারিখে অনুপস্থিত থাকা এবং যথাযথভাবে সাক্ষ্য না দেওয়া পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগেও শত শত পুলিশ সাক্ষীকে চিঠি
সিএমপি সূত্র জানায়, পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে এর আগেও একাধিকবার দাপ্তরিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা আদালতে বিচারাধীন বিভিন্ন মামলায় সাক্ষ্য দিতে ৩৩ পুলিশ সদস্যকে হাজির হওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়। তারা সিএমপির বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও ঢাকা মহানগর পুলিশসহ দেশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত ছিলেন।
এর আগে গত বছরের ১৯ নভেম্বরও একই ধরনের চিঠি দেওয়া হয়। গত কয়েক মাসে অন্তত ১০টি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে তিন শতাধিক পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সিএমপি।
অনেকেই দূরে বদলি, কেউ কেউ অসুস্থ
সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, এরা কেউ আসামি না, এটা হচ্ছে সাক্ষীর বিরুদ্ধে জাস্ট তাগাদা বা তলব। এটা ওই রকম গ্রেফতারি পরোয়ানা নয়, এটা সাক্ষ্য দেওয়ার তাগিদ। অনেকে দূরে বদলি হওয়ার কারণে, অসুস্থতার কারণে, সমন ঠিকমতো না পাওয়ায় বা সমন না পৌঁছানোর কারণে সাক্ষ্য দিতে আসতে পারেন না। আবার কোনো কোনো সাক্ষী মারা গেছেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় সাক্ষীর জন্য মামলা আটকে থাকে, সেগুলো সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তলব। এখানে ৭০০ পুলিশ সদস্য এবং হাজার হাজার পাবলিক সাক্ষী আছে। সবাইকে তলব করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুর রাজ্জাক বলেন, সমন যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়া, পুলিশ সদস্যের অবসর গ্রহণ কিংবা অন্য কোনো কারণে সাক্ষীরা আদালতে নাও আসতে পারেন। এতে মামলার জট বাড়তে থাকে।
তিনি বলেন, একবার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিয়ম অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে শুনানি চালিয়ে যাওয়ার কথা। বিচার দ্রুত করতে সরকার আইন সংশোধন ও নতুন আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সমন কার্যকর করার পাশাপাশি তাদের যাতায়াত খরচ ও আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, পুলিশের সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর সমস্যা। একজন সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে বিচারপ্রার্থী ও রাষ্ট্র উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, বদলি বা প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে তা সমাধান করে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা। আদালতের নির্দেশ ও পরোয়ানার পরও সাক্ষী হাজির না হলে দায় নির্ধারণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিচার দ্রুত করতে শুধু নতুন আদালত নয়, সাক্ষ্যগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটিও কার্যকর করা জরুরি।






