বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। ঠিক এই সময়েই রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় বার্তা দিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী সপ্তাহের নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার গঠনের যে প্রস্তাব জামায়াতে ইসলামী দিয়েছিল, তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, তার দল এককভাবেই সরকার গঠনে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
‘বিরোধী দলে কে থাকবে?’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সমীকরণ যখন জটিল হচ্ছে, তখন তারেক রহমানের এই বক্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশকে স্থিতিশীল করতে নির্বাচনের পর একটি ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে দেশ শাসন করা জামায়াত আবারও সেই পুরোনো সখ্যতায় ফিরতে চেয়েছিল।
কিন্তু রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপির শীর্ষ নেতা পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবির নিচে বসে তিনি বলেন,
“আমি কীভাবে আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সঙ্গে সরকার গঠন করব? তাহলে সংসদে বিরোধী দলে কে থাকবে?”
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান
জামায়াতের আসন প্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও তিনি বলেন,
“আমি জানি না তারা কয়টি আসন পাবে। তবে তারা যদি বিরোধী দলে থাকে, আমি আশা করব তারা একটি গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবেই ভূমিকা পালন করবে।”
জামায়াতের উদ্দেশ্য করে বলেন তারেক রহমান
সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আত্মবিশ্বাসী বিএনপি
দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের নির্বাসন শেষে গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরা ৬০ বছর বয়সী এই নেতা দলের জয়ে শতভাগ আশাবাদী। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ৩০০ আসনের সংসদে তারা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পাবেন। বিএনপি সরাসরি ২৯২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে এবং বাকি আসনগুলো মিত্রদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে।
আসনের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী না করলেও তারেক রহমান বলেন,
“সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন আমরা পাব, এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত।”
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান
যদিও বিভিন্ন জনমত জরিপে বিএনপির জয়ের আভাস মিলছে, তবুও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট—যাদের সাথে জেনারেশন জেড-এর একটি অংশ যুক্ত হয়েছে—তারাও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্রনীতি: ভারত না চীন?
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপড়েন এবং চীনের প্রভাব বিস্তার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। নির্বাচনে জয়ী হলে বিএনপি কোন দিকে ঝুঁকবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান অত্যন্ত কৌশলী ও রাষ্ট্রনায়কোচিত উত্তর দেন।
তিনি বলেন, “প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের এই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সক্ষম, এমন অংশীদারই আমাদের প্রয়োজন।” কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম না নিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, “বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে যারা আমাদের মানুষের উপকারে আসবে, তাদের সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্ব হবে। আমরা তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান চাই, বিনিয়োগ চাই।”
রোহিঙ্গা ইস্যু ও প্রতিপক্ষের রাজনীতি
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রসঙ্গে তারেক রহমান জানান, তিনিও চান রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাক। তবে জোর করে নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হলেই প্রত্যাবাসন সম্ভব। তিনি বলেন, “যত দিন না তাদের ফিরে যাওয়ার মতো নিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তত দিন তারা এখানে থাকতে পারবে।”
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার সন্তানদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“জনগণ যদি কাউকে গ্রহণ করে এবং স্বাগত জানায়, তবে রাজনীতি করার অধিকার সবারই আছে।”
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান
দীর্ঘ নির্বাসন ও রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন একক সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে। জামায়াতের জাতীয় সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, আগামী দিনের বাংলাদেশে বিএনপি নিজস্ব স্বকীয়তা ও একক শক্তিতেই দেশ পরিচালনা করতে চায়।






