গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এককভাবে ২০৯টিতে জয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটি নির্বাচিত সরকার গঠন এবং এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বে এ যাত্রা শুরু হচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সদস্যরা সকাল ১০টায় শপথ নেবেন। বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান। সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকার এ দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সংবিধান অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভার শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রায় ১ হাজার ২০০ দেশি-বিদেশি অতিথি অংশ নেবেন, যার মধ্যে ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি রয়েছেন।
আলোচনায় মন্ত্রিসভা
আজ বিকেলেই জানা যাবে নতুন মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন। বিষয়টি এখন সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গণমাধ্যমে কয়েক দিন ধরে এ নিয়ে নানা সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার মন্ত্রিসভা খুব ভেবেচিন্তে গঠন করা হচ্ছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদসহ জ্যেষ্ঠ অনেক নেতা মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকসহ আরও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রীর নামও আলোচনায় রয়েছে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে পর্যায়ক্রমে শপথ গ্রহণ হবে। এরপর বিকেল ৪টায় মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে।
পাশাপাশি তরুণ অনেক নেতাকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, হুমায়ুন কবির, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, খন্দকার আবদুল মুক্তাদির (সিলেট-১), অনিন্দ্য ইসলাম (যশোর-৩), জাকারিয়া তাহের (কুমিল্লা-৮) ও ফারজানা শারমিন (নাটোর-১) প্রতিমন্ত্রী বা মন্ত্রী হতে পারেন—এমন আলোচনা রয়েছে।
বিএনপির জোটসঙ্গীদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-এর আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি এবং গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক-এর নামও আলোচনায় আছে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ইস্যু করা হচ্ছে। কোনো কারণে আমন্ত্রণপত্র হাতে না পেলে সংসদ ভবনের টানেলের অভ্যন্তরে মূল প্রবেশপথে অবস্থিত ‘ফ্রন্ট ডেস্ক’ থেকে তা সংগ্রহ করা যাবে। তবে নির্বাচিত সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সঙ্গে রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
একটি নতুন যাত্রার প্রত্যাশা
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতন হলে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সেই সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পায়।
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বিভেদ ঘুচিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। এতে সর্বত্র আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি। জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে আবদুল মঈন খানের নামও আলোচনায় আছে।
স্মৃতিতে ফিরছে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সাল
আজ ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি—তারেক রহমান যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন, তখন অনেকের স্মৃতিতে ফিরে আসছে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সাল।
১৯৭৯ সালের ১৬ এপ্রিল তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ধারায় প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। তাঁর মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন ৪২ জন।
১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ তাঁর মা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁকে শপথ পড়ান। সে মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন ৩১ জন। ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর মন্ত্রিসভায় সদস্যসংখ্যা ছিল ৬০ জন।
বার্তা বাজার/এস এইচ






