বিরোধী দলকে দুর্বল করার প্রবণতার সমালোচনা করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, একটা চমৎকার প্রবণতা লক্ষ্য করছি। প্রায় সবাই কুচিকুচি করে কাটার পরে বলেন, এগুলো ছাড়েন, আমাদের সঙ্গে চলে আসেন। আমরা ওই কুচিকুচি করার জন্য আসি নাই।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সোমবার জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা এসব কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে, সরকারি দল যা চাইবে, বিরোধী দল সেটাই সমর্থন করবে। আবার বিরোধিতার খাতিরে সবকিছুর বিরোধিতাও করা উচিত নয়। সরকারি দলের বিরোধী দলকে সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হবে, আর বিরোধী দলেরও সংগত সব বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে।
সংসদকে সরকারি দল ও বিরোধী দল দুই ‘চাকার’ ওপর চলা যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বিরোধী দলকে দুর্বল করার চেষ্টা না করে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অতীতের সংসদীয় ব্যক্তিপূজা ও চরিত্রহননের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
অতীতের সংসদীয় চর্চার সমালোচনা করে জামায়াতের আমির বলেন, ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য অতীতে গান হয়েছে, কবিতা হয়েছে, স্বপ্নবিলাস হয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে এই সংসদে এটা দেওয়া উচিত না। এটা তোষামোদের জায়গা না, এটা দায়িত্ব পালনের জায়গা।
আগের দিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জামায়াতের কড়া সমালোচনা করেন। জামায়াতকে একাত্তরের জন্য ক্ষমা চাইতে বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। এর প্রতি ইঙ্গিত করে স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই সংসদে চরিত্রহননের কোনো কাজ যেন না হয়।
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের চার লেন প্রকল্প দ্রুত শেষ করা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, ভোলা সেতু নির্মাণ এবং প্রধান নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের সহযোগিতায় নেওয়া মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, আমরা নামের কাঙাল নই, আমরা কাজের কাঙাল। কাজটাই দেখতে চাই।
স্বাস্থ্য খাত প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর জনবল, সরঞ্জাম ও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে একই ধরনের তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বেশি হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই মানদণ্ড প্রয়োগ হয় না।
শফিকুর রহমান কওমি মাদ্রাসার জন্য বাজেটে বরাদ্দ, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দ্রুত ফিরিয়ে আনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রবাসীর সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
জামায়াত আমির বলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও রাষ্ট্রের নাগরিক। তাই তাদেরও রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কওমি মাদ্রাসাগুলোর প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করে তাদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখেই সহায়তার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করে তিনি বলেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়েও সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি গবেষণাভিত্তিক না হয়, তাহলে চিরজীবন আমরা আমদানি নির্ভরই থেকে যাব।
পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বৈষম্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা গেলে সেখানে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সাড়ে ১৫ বছরে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, ওই পাচার অর্থের নয় ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে আমাদের কোনো বাজেট ঘাটতি থাকবে না। সম্পদের সঙ্গে অপরাধীকে ফিরিয়ে আনতে হবে। সম্পদ এলো, আর অপরাধীরা থেকে গেল- তাহলে সঠিক শিক্ষা হবে না।
রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, ব্যবসায়ীর ওপর অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের চাপ কমাতে হবে। তাহলে ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ট্যাক্স দিতে আগ্রহী হবে।
প্রবাসী শ্রমিকের সমস্যা তুলে ধরে বিরোধী দলের নেতা সংসদের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, যেখানে ৮৫ হাজার টাকায় যাওয়ার কথা, সেখানে শ্রমিকের কাছ থেকে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে।
মুক্তিযোদ্ধা ভাতা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে জামায়াতের আমির অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ও নির্যাতিতদেরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিচার কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, যত বড়ই হোক, সব অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
বাজেট বাস্তবায়নে নিয়মিত মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন বিরোধী দলের নেতা। তিনি বলেন, প্রতি তিন বা চার মাস অন্তর বাস্তবায়ন অগ্রগতি সংসদে উপস্থাপন করা উচিত। পাশাপাশি অর্থবছর জুলাই-জুনের বদলে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করারও প্রস্তাব দেন।






