ঢাকা   রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

ভারতীয় নিম্নমানের বীজে পথে বসেছেন ঝিনাইদহের শত শত প্রান্তিক চাষী

Authorস্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ০৯:১০ পিএম

ভারতীয় নিম্নমানের বীজে পথে বসেছেন ঝিনাইদহের শত শত প্রান্তিক চাষী

প্রান্তিক চাষীরা মাঠ থেকে তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ ঘরে আনলেও অন্যতম এই কৃষিপণ্যে এবার হয়েছে স্বপ্নভঙ্গ। বাজারে এনে বিক্রি করতে না পারায় হাজার হাজার মন পেঁয়াজ ঢেলে ফেলছেন পানিতে। নিম্নমানের ভারতীয় বীজের এই পেঁয়াজে ধরছে পঁচন, সংরক্ষণ যোগ্য না হওয়ায় বাড়িতে পঁচা-গলা আর দুর্গন্ধে টেকা দায়। হাহাকার চলছে শত শত প্রান্তিক কৃষক পরিবারে। এই দৃশ্য দেশের পঞ্চম ও খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত এলাকা ঝিনাইদহে। বীজ কিনে কৃষকেরা প্রতারিত হয়েছে জানালেও কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে এসব চক্রের বিরুদ্ধে নেই কোন পদক্ষেপ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পানিতে ভাসছে কৃষকের ঘাম ঝরা, রক্তপানি করা পরিশ্রমের পেঁয়াজ। দেখতে অনেক টা আপেলের মতো বড় বড় সাইজের উজ্জ্বল লালচে রঙের হাজার হাজার মন পেঁয়াজ কৃষকের বাড়ির আশপাশের ডোবা-নালায় পড়ে আছে। পঁচা-দুর্গন্ধ ভাসছে আকাশে-বাতাসে। গৃহবধুরা প্রতিদিনই বস্তা আর ঝুড়ি ভরে ঘরের মাচা থেকে এনে ঢালছে পানিতে। চাষীদের স্বপ্নের ফসলের এ এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য।

কৃষকদের অভিযোগ মেহেরপুর, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঝিনাইদহের শৈলকুপার অসাধু ব্যবসায়ী ও বীজ প্রতারক চক্র নিন্মমানের ভেজাল বীজ এনে প্রান্তিক চাষীদের কাছে বিক্রি করছে । চলতি মৌসুমে সেসব বীজে সুখসাগর, লালতীর বা দেশীয় ভাল মানের পেঁয়াজ না হয়ে ভারতীয় নিন্ম মানের নাসিক জাতের পেঁয়াজ হয়েছে। যা সংরক্ষণ যোগ্য নয় এবং দ্রুত পঁচনশীল। এসব পেঁয়াজ বিঘা প্রতি দেড়শ মনেরও বেশী ফলন হলেও নেই কোন দাম। প্রতিমন ১’শ থেকে ২শ টাকাও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা উৎপাদিত সমস্ত পেঁয়াজ ডোবা-নালা, খালে-বিলে ফেলে দিচ্ছে।

শৈলকুপার প্রান্তিক চাষী মনোহরপুর গ্রামের রাজন এবার ২ বিঘা জমিতে করেছিলেন পেঁয়াজের চাষ রাজন উপজেলার থানা রোডের লাকী বীজ ভান্ডার থেকে সুখসাগর বীজ হিসাবে প্রায় ৯হাজার টাকা কেজি দরে কিনেছিলেন বীজ। তবে পেঁয়াজ উঠানোর সময় দেখেন নাসিক জাতের পেঁয়াজ, যা বড় বড় আকারের, ফলনও ভাল তবে বাড়িতে রাখার সময় ৩/৪ দিনের ব্যবধানে তাতে ধরে পঁচন। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে ২ শ মনের বেশি পেঁয়াজের বেশীর ভাগই ফেলে দিয়েছেন খালে, আর যা আছে সেগুলোও পঁচে যাওয়ায় উঠানে ফেলে রেখেছেন। মনোহরপুর গ্রামের একই পরিবারের ৪ কৃষকের ৬শ মনেরও বেশি পেঁয়াজ ফেলেছে পানিতে।

একই এলাকার হাসান, ফরিদ, শহীদ সহ অর্ধশত কৃষকসহ উপজেলা জুড়ে কয়েক হাজার কৃষক তাদের হাজার হাজার মন পেঁয়াজ হয়েছে নাসিক বা ভারতীয় নিম্নমানের জাত। ফলে সেসব পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি না হওয়ায় ফেলছেন ডোবাতে । অনেকের ঘরের মাচায় অতি যত্নে রাখা কিছু রয়েছে সেসব পেঁয়াজের খোলসেও ধরছে পচন। বাড়ির গৃহবধূরা এসব বেছে বেছে ফেলে দিচ্ছেন।

উপজেলার ধলহরাচন্দ্র গ্রামের এক কৃষক দেড়শো মন পেঁয়াজ ফেলে দিছেন পাশের ডোবাতে । শৈলকুপা বাজারের ব্যবসায়ী আলমগীর অরণ্য জানান, অনেক প্রান্তিক চাষির সব পেঁয়াজই এভাবে পঁচন ধরছে, তারা বাজারে আনলেও ব্যবসায়ী, পাইকার সেসব পেঁয়াজ কিনছেন না। তিনি বলেন অনেক কৃষক ক্ষোভে বাজারেই ঢেলে খালি বস্তা হাতে নিয়ে ফিরছেন বাড়িতে।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, খুলনা বিভাগের সর্বাধিক পেঁয়াজ উৎপাদিত এলাকা হিসাবে খ্যাত শৈলকুপার চাষীরা এবার সার-বীজ, কীটনাশক সংকটে পড়ে চাষের শুরুতেই । সরকারের ভর্তুকীর প্রয়োজনীয় ডিএপি সার বিসিআইসির ডিলার-সাব ডিলাদের মধ্যে চলে লুটপাট, করা হয় কৃত্তিম সংকট। ফলে ১ হাজার টাকা বস্তার সার চাষীদের কিনতে হয় ২ হাজার টাকারও বেশি দাম দিয়ে, তবুও পাননি অনেক কৃষক। সারের জন্য কয়েকটি স্থানে ঘটে সহিংসতাও। প্রয়োজনীয় সার-ওষধ না পাওয়ায় বাড়তি দামে উৎপাদন খরচ হয়ে যায় দ্বিগুন-তিনগুণ।

এসবের পরেও শৈলকুপায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করে কৃষকেরা। তারা মোট ১২ হাজার ৮শ৩৬ হেক্টর জমি জুড়ে আবাদ করে পেঁয়াজের।

তবে পেঁয়াজ তোলার পর চাষীরা দেখতে পায় কাঙ্খিত জাতের বদলে তাদের জমিতে হয়েছে ভারতীয় নিন্মমানের নাসিক জাতের পেঁয়াজ। যা দু থেকে ৫দিনও সংরক্ষণ করা যায় না, ধরে পঁচন। অধিকাংশ প্রান্তিক চাষীর ১ বিঘা, ২ বিঘা বা পুরো জমির সবই হয় এ জাতের। অনেকে তড়িঘড়ি বাজারে আনলেও ১টি পেঁয়াজও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে সেখানেই ঢেলে ফেলছে, কয়েক হাজার কৃষকের হয়েছে এমন সর্বনাশ।

ব্যবসায়ী ও পাইকাররা বলছেন, সুখসাগর বা লালতীর কিং বা দেশীয় জাত ছাড়া এই নাসিক জাতের পেঁয়াজ ক্রয়যোগ্য নয়, ফলে কেউ কিনছে না, সংরক্ষণ অযোগ্য এসব পেঁয়াজ। পেঁয়াজ চাষী রামিম হাসান জানান, তার লক্ষ ছিল এবার পেঁয়াজ বিক্রি করে বাড়ি-ঘরের সংস্কার কাজ করবেন তবে সে আশা পূরণ হলো না। তিনি জানান, তার ৩/৪ বিঘা জমির সবই হয়েছে এই নিন্মমানের, প্রতারিত হয়েছে অসাধু বীজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বীজ কিনে।

শৈলকুপার বীজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কৃষকরা বীজ কিনে এভাবে প্রতারিত হয়েছেন। তবে বীজ ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, ভেতরে কি বীজ আছে তা তারা নিজেরাও জানতেন না। কিন্তু কৃষকেরা এসব ব্যবসাযীর এমন কথার সাথে একমত নন, অধিক লাভে নিম্নমানের বীজ পরিকল্পিত ভাবে বিক্রি করা হয় বলে চাষীদের অভিযোগ।

শৈলকুপার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাসিক জাতের বিপরীতে বাজারে সুখসাগর, লালতীর কিং সহ দেশীয় জাতের পেঁয়াজ ৮শ থেকে হাজার টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে খুশী নন অন্যান্য চাষীরাও। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বিঘা প্রতি এবার তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর শৈলকুপায় ১২ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৮০৫ হেক্টর বেশি। হেক্টর প্রতি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০.২টন, তবে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ২০.৭ টন । এবার মোট উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার টনের বেশি পেঁয়াজ ।

এদিকে বীজ প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে দেশীয় বা উন্নত জাতের বদলে কেজি প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় নাসিক জাতের বীজ কিনে প্রান্তিক চাষীরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে, এমন কথা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করলেও তাদের বিরুদ্ধে নেয়নি কোন পদক্ষেপ।

শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান খান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কিছু কৃষকের বীজের টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। এভাবে ক্ষতিগ্রস্তরা আবেদন করলে তাদের বীজের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে। তবে বীজ প্রতারক চক্র নিয়ে তাদের নেই কোন মাথাব্যাথা।

 

বার্তা বাজার/এমএমএইচ

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!