ঢাকা   শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

এনসিপিতে যোগদানের চাপে আত্মগোপনে ধনকুবের মনজুর আলম!

Authorস্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ০১:২৩ পিএম

এনসিপিতে যোগদানের চাপে আত্মগোপনে ধনকুবের মনজুর আলম!

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগরের শীর্ষ পদে যোগ দিচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মনজুর আলম— মাসখানেক ধরে চট্টগ্রামে এমন আলোচনা তুঙ্গে। দলটির পক্ষ থেকে তাকে আসন্ন চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে লড়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি এনসিপির শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ চট্টগ্রামে মনজুর আলমের বাসভবনে গিয়ে দেখা করার পর এই গুঞ্জন আরও জোরালো হয়।

সবশেষ বৃহস্পতিবার (৭ মে) এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষ নেতারা চট্টগ্রাম সফরে যান এবং বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এনসিপি নেতাদের চেষ্টা ছিল, ওই অনুষ্ঠানেই মনজুর আলমকে দলে যোগদান করানোর। তবে, রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও পারিবারিক চাপে শেষ পর্যন্ত তিনি এনসিপিতে যোগ দেননি।

মনজুর আলমের ঘনিষ্ঠ সূত্র এবং এনসিপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক মাস আগেও তিনি এনসিপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ছিলেন। দলটির চট্টগ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অনুদানও দিয়েছেন। গত রমজানে নগরের একটি কনভেনশন সেন্টারে এনসিপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রকাশ্যে অনুদান দেওয়ার পর তাদের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে। ওই অনুষ্ঠানে সরবরাহ করা পানির বোতলে মনজুর আলমের ছবি থাকার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি নানামুখী চাপে পড়েন।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মনজুর আলমের জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগদান নিয়ে চট্টগ্রামে ব্যাপক গুঞ্জন চলছে। এনসিপির শীর্ষ নেতারা তাকে দলে ভেড়াতে এবং চসিক নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী করতে আগ্রহী। তবে, নানামুখী রাজনৈতিক ও পারিবারিক চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত গত বৃহস্পতিবার দলটির চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানে যোগ না দিয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান

বারবার রাজনৈতিক দলবদল করা মনজুর আলম প্রথমে আওয়ামী লীগ, তারপর বিএনপি থেকে মেয়র এবং পরবর্তীতে আবার আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন, যা নিয়ে চট্টগ্রামজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার চেষ্টায় ছিলেন। এ লক্ষ্যে বিএনপির একটি কর্মসূচিতে তাঁর মালিকানাধীন কোম্পানি থেকে পানি বিতরণ করতেও দেখা যায়। কিন্তু চসিক নির্বাচনে বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী থাকায় তার মনোনয়ন অনেকটাই অনিশ্চিত ছিল। অন্যদিকে, এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরের কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা তাকে নিয়ে নির্বাচন করাতে আগ্রহী হন। এ নিয়ে এনসিপি নেতাদের সঙ্গে মনজুর আলমের দফায় দফায় বৈঠক হয় এবং শুরুতে তিনি রাজিও হয়েছিলেন।

কিন্তু রমজানে মনজুর আলমের এনসিপিতে যোগদানের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উভয় দলের সুবিধাভোগী নেতার আবার এনসিপিতে যাওয়াটা কেউ মেনে নিতে পারেননি। এছাড়া, তার রাজনৈতিক উপদেষ্টারা তাকে বোঝান যে এনসিপি যেহেতু জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে, সেহেতু চসিকে তিনি এনসিপির হয়ে নির্বাচন করলে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পাবেন না। এ কারণে মনজুর আলম ভেতরে ভেতরে এনসিপির সমর্থন নিয়ে প্রকাশ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার চেষ্টা করছিলেন।

গত ১৪ এপ্রিল এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ উত্তর কাট্টলীতে মনজুর আলমের বাসায় যান। খবর পেয়ে সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়ো হন। বৈঠক শেষে মনজুর আলমের বাসা থেকে বের হতেই তোপের মুখে পড়েন হাসনাত আবদুল্লাহ। ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা স্বৈরাচারের দোসরদের সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ তুলে তাকে ঘিরে ধরে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন। খবর পেয়ে আকবর শাহ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে হাসনাত আবদুল্লাহকে নিরাপদে বের করে নিয়ে আসে।

বারবার দলবদল করা মনজুর আলম প্রথমে আওয়ামী লীগ, পরে বিএনপি এবং পরবর্তীতে আবারও আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আবারও দলবদল করার চেষ্টা করায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সংখ্যালঘুদের ভোট হারানোর আশঙ্কা এবং পারিবারিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি আপাতত রাজনীতি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মনজুর আলম আরও চাপে পড়ে যান। ঘনিষ্ঠজনদের ভিন্ন ভিন্ন মত ও অনুরোধে তিনি দোটানায় পড়েন। অন্যদিকে, এনসিপি নেতারা যেকোনো মূল্যে তাকে দলে ভেড়াতে আগ্রহী ছিলেন। তারা চেয়েছিলেন বৃহস্পতিবার মনজুর আলমকে বুঝিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে আসবেন। কিন্তু এই আশঙ্কায় ঘনিষ্ঠজনদের পরামর্শে বুধবার থেকেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান মনজুর আলম।

বৃহস্পতিবার এনসিপিতে যোগদানের গুঞ্জন ছড়ালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তৎপর হন এবং দিনভর তার বাসা ও অফিসে খোঁজ নেন। তবে, কোথাও তার হদিস পাওয়া যায়নি।

সিএমপির এক কর্মকর্তা  বলেন, ‘শুরুতে তথ্য ছিল এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষ নেতারা বিমানযোগে চট্টগ্রামে পৌঁছাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাসনাত আবদুল্লাহ ছাড়া বাকিরা সড়কপথে আসেন। একপর্যায়ে খবর আসে এনসিপির শীর্ষ নেতারা মনজুর আলমের বাসায় যাচ্ছেন এবং সেখানে বৈঠক হবে। তাকে বুঝিয়ে প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হবে।’

সিএমপির এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)বলেন, শুরুতে তথ্য ছিল এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষ নেতারা বিমানযোগে চট্টগ্রামে পৌঁছাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাসনাত আবদুল্লাহ ছাড়া বাকিরা সড়কপথে আসেন। একপর্যায়ে খবর আসে এনসিপির শীর্ষ নেতারা মনজুর আলমের বাসায় যাচ্ছেন এবং সেখানে বৈঠক হবে। তাকে বুঝিয়ে প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মনজুর আলম বাসায় ছিলেন না এবং এনসিপি নেতারাও সেখানে যাননি। এনসিপি নেতারা বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানে যোগ দেন, সেখানে কয়েকজন নতুন সদস্য যোগ দিয়েছেন।

‘কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মনজুর আলম বাসায় ছিলেন না এবং এনসিপি নেতারাও সেখানে যাননি। এনসিপি নেতারা বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানে যোগ দেন, সেখানে কয়েকজন নতুন সদস্য যোগ দিয়েছেন।’

এ বিষয়ে চসিকের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে একাধিকবার কল করা হলেও তার সংযোগ পাওয়া যায়নি। তবে তার ছেলে সরওয়ার উল আলম জানান, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার বাবা আপাতত কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবেন না। তিনি আড়ালে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

মনজুর আলমের রাজনৈতিক পরিচয়

মোহাম্মদ মনজুর আলম চট্টগ্রামের মোস্তফা হাকিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় আওয়ামী লীগের মাধ্যমে। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ছিলেন এবং টানা চারবার চসিকের ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তৎকালীন মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হলে তিনি প্রায় দুই বছর ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন।

২০১০ সালের চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন মনজুর আলম। ওই নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রায় এক লাখ ভোটে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

চসিকের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে একাধিকবার কল করা হলেও তার সংযোগ পাওয়া যায়নি। তবে তার ছেলে সরওয়ার উল আলম জানান, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার বাবা আপাতত কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবেন না। তিনি আড়ালে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন
তবে, ২০১৫ সালের চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় নির্বাচনের দিনই কারচুপির অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করেন এবং রাজনীতি থেকে স্থায়ী অবসরের ঘোষণা দেন। যদিও পরবর্তীতে তাকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় দেখা যায়। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করেছিলেন।

সবশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কখনও বিএনপি, আবার কখনও এনসিপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন মনজুর আলম।

 

বার্তা বাজার/এস এইচ

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!