দেশি গরুর চাহিদা বাড়াতে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী এবার কোরবানির ঈদের আগে সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো পশুর হাট ইজারা না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এই ঘোষণা কার্যকর হচ্ছে না সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকায়। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর সীমান্ত লাগোয়া মহিষখলা গরুর হাট এবং দোয়ারাবাজারে ভোগলা গরুর হাটে চলছে ভারতীয় গরুর রমরমা বাণিজ্য।
অথচ হাওরাঞ্চলের সব কটি উপজেলায় এবার ফসলহানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা গরু বিক্রির জন্য ছুটছেন পাইকারের কাছে। কেউ কেউ গরু নিয়ে ছুটছেন বাজারে বাজারে। কৃষকরা বলেছেন, অতিবৃষ্টিতে ধান ডুবে যাওয়ায় এবার খড়ও পচে গেছে পানিতে। এই অবস্থায় খাদ্য সংকটের কারণে গরু পালন কঠিন হতে পারে। এই চিন্তা থেকে কৃষকরা গোয়ালের গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। এর মধ্যে সীমান্তের নানা পয়েন্ট দিয়ে অবাধে ভারতীয় গরু আসায় দেশি গরুর কমে গেছে।
দেখার হাওরপারের ইসলামপুর গ্রামের কৃষক মাসুক মিয়া বললেন, গরু ছিল ৬টা। একটা ৬০ হাজার টাকার গরু ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। বাকি গরুও বিক্রি করে ফেলবেন। না হলে এসব গরুকে খাওয়াবেন কী? মাসুক মিয়ার ভাষ্য, সামনে কোরবানির ঈদ। এ কারণে বাজারে ভারতীয় গরু আসায় দেশি গরুর দাম আরও কমে যাবে। একই মন্তব্য করেন আব্দুল অদুদ নামের আরেক কৃষক।
কৃষকদের এই দুশ্চিন্তা দূর করতে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ৩ মে সচিবালয়ে তাঁর সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে এবং দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় এবার সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো পশুর হাট ইজারা দেওয়া হবে না। তবে মন্ত্রীর এই ঘোষণা শুধু ঘোষণা হিসেবেই থাকছে। সুনামগঞ্জে সেটা কার্যকরের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলায় সীমান্ত-লাগোয়া মহিষখলা বাজারে প্রতি মঙ্গলবার এখনও রীতিমতো ভারতীয় গরুর হাট বসছে। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে হাটে ভারত থেকে অবৈধভাবে গরু আমদানির প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জানা যায়, চলতি বছর মহিষখলা বাজারটি ইজারা দেওয়ার জন্য এক কোটি ১৬ লাখ ৬২ হাজার ৬৬৮ টাকা বার্ষিক ইজারামূল্য নির্ধারণ করে পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করে প্রশাসন। কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে কোনো দরপত্রদাতা না পাওয়ায় প্রশাসন বাংলা সালের ৩ বৈশাখ থেকে অবশিষ্ট সময় (৩০ চৈত্র, ১৪৩৩ পর্যন্ত) খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়। ৬১ লাখ ৪০ হাজার মূল্যে বাজারটি খাস কালেকশনে ইজারা পেয়েছেন বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. মোক্তার হোসেন।
বাজারটি সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় সহজেই অবৈধভাবে আসা ভারতীয় গরুতে সয়লাব থাকে। আর এসব অবৈধ গরুকে বৈধতা দিয়ে প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ কারণে কোরবানি ঈদ পর্যন্ত এই পশুর হাটটি বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় খামারিরা।
মহিষখলা বাজারের ইজারাদার মো. মোক্তার হোসেন বললেন, প্রতি মঙ্গলবার এখানে পশুর হাট বসে। আলাদা করে কোরবানির হাট বসে না। সীমান্তে পশুর হাট বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা আছে– এমনটি তিনি জানেন না। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনও তাঁকে কিছু জানায়নি।
চোরাচালানের হটস্পট বোগলাবাজার
জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলা সীমান্ত এখন যেন এক অদৃশ্য চোরাচালান করিডোরে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই সক্রিয় হয়ে উঠে চোরাকারবারি চক্র। ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা দোয়ারাবাজার উপজেলার পাহাড়, জঙ্গল ও সমতল মিশ্রিত দুর্গম এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, সীমান্ত দিয়ে আসা ভারতীয় গরুর বড় একটি অংশ প্রথমে বোগলাবাজার এলাকার বিভিন্ন খামারে রাখা হয়। পরে স্থানীয় হাটে তুলে সেগুলোকে দেশীয় গবাদি পশু হিসেবে বৈধতার সুযোগ দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ কাজে কিছু ইজারাদার ও খামারির সম্পৃক্ততা রয়েছে। খামারে কয়েক ঘণ্টা বা এক রাত রাখার পর গরুগুলো সহজেই স্থানীয় গরু হিসেবে বাজারজাত করা হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয় এসব গবাদি পশু।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, বোগলাবাজার এলাকার কয়েকটি খামারে দিনের বেলায় তেমন কার্যক্রম না থাকলেও রাতে গরু এনে রাখা হয়। প্রতিটি গরুর জন্য ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা জানান, বর্তমানে কিছু খামারে অস্থায়ীভাবে গরু রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দোয়ারাবাজার ইউএনও অরুপ রতন সিংহ বললেন, খবর পেয়েছি, ভোগলা বাজারে ভারতীয় গরু ঢুকেছে। আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। থানার ওসি তারিকুল ইসলাম বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল বলেন, সীমান্তের কিছু হাট বন্দোবস্ত দেওয়া আছে আগে থেকেই। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এগুলোর বিষয়ে আলাদা কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
বার্তা বাজার/এস এইচ






