ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Logorb
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

‘সড়ক টেন্ডার’ দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

Authorস্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:০৭ এএম

‘সড়ক টেন্ডার’ দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক। এই পাচারকাজ ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি চক্র। এজন্য বরিশাল নগরীর মধ্য দিয়ে যাওয়া দপদপিয়া ব্রিজ থেকে গড়িয়ার পাড় পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়ক পাচারকারীদের কাছে টেন্ডারের মাধ্যমে লিজ দেওয়া হয়েছে। বিনিময়ে ২০ হাজার টাকা করে প্রতিদিন চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। এভাবে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার রেণু পাচার করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাচারকাজের সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, টেন্ডারের মাধ্যমে পাচারকারীদের কাছে সড়ক লিজ দিয়ে চাঁদাবাজির নেতৃত্বে রয়েছেন মহানগরের যুবদলের এক নেতা। তার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন মোহাম্মদ রনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ পাচারকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে পাচারের সঙ্গে জড়িত নেতাকর্মীও। বর্তমানে বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এই পাচারের কাজের সহযোগী হিসেবে জড়িত আছেন।

অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, রেণু পাচারের নেতৃত্বে আছেন নগরীর পলাশপুরের বাসিন্দা পোর্ট রোডের আড়তদার মোহাম্মদ রনি, গোপালগঞ্জের টুলু। তাদের সহযোগিতা করছেন বিএনপি নেতা তৌহিদ হোসেন, জসিম উদ্দিন, ভোলার শিপন, বরিশাল-ভোলা মহাসড়কের লাহারহাট ফেরিঘাটের দেলোয়ার মৃধা। এর মধ্যে দেলোয়ার মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের ভাই। এ ছাড়া বাকেরগঞ্জের গোমা ফেরিঘাট এলাকার ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আব্দুল মান্নান এবং নগরীর ২৩, ২৪ ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী। আরও রয়েছেন নগরীর পলাশপুরের হারুন ওরফে পাতিল হারুন, পেয়ারা রোডের বিপ্লব হোসেন এবং কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের ট্রলারের মাঝিরাও পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা নিয়ে পাচারকাজে সহযোগিতা করছেন তারা।

রেণু পাচারের সঙ্গে জড়িত তিন জন ব্যক্তি জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে রনি রেণু পাচারকারী টুলুকে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করে পাচারকাজের নিয়ন্ত্রণ নেন। কয়েক মাস আগে টুলু জেল থেকে বের হওয়ার পর আবার রনির সঙ্গে বৈঠক করেন। নগরীর আকাশ হোটেল ও এরিনা হোটেলে একাধিক বৈঠক হয় তাদের। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল রেণু পাচারের রুটের টেন্ডার। রনি ওই বৈঠকে সড়কের টেন্ডার ডেকে বলে দেন, প্রতিদিন যে ২০ হাজার টাকা করে তাকে চাঁদা দিতে পারবে সেই বরিশালের ওই ১২ কিলোমিটার সড়ক দিয়ে রেণু পোনা পাচার করে নিয়ে যেতে পারবে। টেন্ডারে সিদ্ধান্ত হয় টুলু প্রতিদিন রনিকে ২০ হাজার টাকা করে চাঁদা দিয়ে রেণু পাচার করবে। এই পথের যেখানে যত টাকা লাগবে, তা টুলুকে খরচ করতে হবে। ওই বৈঠকের পর থেকে টুলু ২০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে রেণু পাচারের দায়িত্ব নেয়।

নগরীর আকাশ হোটেল ও এরিনা হোটেলে বৈঠকের ছবি এবং ভিডিওতে এর সত্যতা মিলেছে। ওই বৈঠকে উপস্থিত দুজন ও পাচারকাজে সংশ্লিষ্ট একজন জানিয়েছেন, এসব রেণু পাচার হচ্ছে ভোলা, বরগুনা ও পটুয়াখালী উপকূলীয় এলাকা থেকে। সেখানে পাচারকারীদের দাদন দেওয়া থাকে। হতদরিদ্র পরিবারগুলো ওই দাদনের বিনিময়ে রেণু পোনা ধরে তাদের কাছে কম দামে বিক্রি করে দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সাগর-নদী পেরিয়ে রেণু চলে আসছে পটুয়াখালীর বাউফলে কালাইয়া লঞ্চঘাট, বরিশালের বাকেরগঞ্জের লেবুখালী সেতু সংলগ্ন এলাকা, বাকেরগঞ্জের বোমা ফেরিঘাট, ভোলার লাহারহাট ফেরিঘাট, বরিশাল সদর উপজেলার নেহালগঞ্জ ফেরিঘাট, বাবুগঞ্জের মিরগঞ্জ ইটভাটা এলাকা, দোয়ারিকা শিকারপুর ব্রিজের নিচ এলাকা, বরিশাল সদর উপজেলার তালতলী ও শায়েস্তাবাদ এলাকায়। এসব স্থান থেকে রেণু পোনা ট্রাকে তুলে তা বরিশালের রুট ব্যবহার করে খুলনা ও বাগেরহাটে পাচার করা হয়। এসব এলাকা ব্যবহার করতে সেখানকার বিএনপি নেতাকর্মীদের দিনে পাঁচ হাজার করে চাঁদা দিতে হয়। বিনিময়ে নিজ নিজ এলাকা পার করে দেন তারা।

পাচারকাজে ব্যবহার করা হয় নির্দিষ্ট ট্রাক। গাড়িগুলোর সামনে থেকে ফোনে দিকনির্দেশনা দেন অন্তত চার জন ব্যক্তি। দিকনির্দেশনার কাজে সংশ্লিষ্ট দুজন বলেন, ‘বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে রেণু গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়। এক পথে প্রশাসন কিংবা পুলিশের নজরদারি থাকলে অন্য রুট ব্যবহার করা হয়। আমরা তিন-চার জন মোটরসাইকেল নিয়ে রেণু বহনকারী ট্রাকের সামনে পৃথক একটি গাড়ি চালাতে থাকি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অথবা অন্য কোনও সমস্যা থাকলে আমরা সামনে থেকে সিগন্যাল দিলে গাড়ি দিক পরিবর্তন করে অন্য রুটে যায়। এ ছাড়া ওসব পথে যতগুলো থানা আছে সেগুলোতে আগেই চাঁদা দিয়ে দেন টুলু। রাত ১২টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত রেণু পাচারে তেমন কোনও সমস্যা হয় না। রেণু বহনকারী ট্রাকের মালিকও টুলু। যার ফলে পাচারের বড় একটি অংশ থাকে তার।’

পাচারকাজে সংশ্লিষ্ট আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রূপাতলী, আমতলার মোড়, চৌমাথা, কাশিপুর চৌমাথা এসব এলাকা পার করার দায়িত্ব সেখানকার বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর। এজন্য প্রতিদিন সন্ধ্যায় নগরের পোর্ট রোড শিকদার হোটেলে বৈঠক হয় রনির নেতৃত্বে। সেখান থেকে রুট ঠিক করা হয় আজ কোনও রুটে রেণু পাচার করা হবে। এক হাজার বাগদা চিংড়ির রেণু কেনা হয় তিন হাজার টাকায়। তা খুলনা ও বাগেরহাটে বিক্রি করা হয় সাত থেকে আট হাজার টাকায়। কোনও টাকা বকেয়া থাকে না।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, ‘বিষয়টি প্রশাসনকে জানাতে হবে। তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত নেতাকর্মীদের দলে রাখবেন না। চিহ্নিত হলে তাদের দল থেকে বহিষ্কারসহ আইনি পদক্ষেপ নেবেন।’

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বলেন, ‘বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা পাচারে যারাই জড়িত থাকুক, যেই রাজনৈতিক দলেরই হোক; তথ্য-প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেকোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। রেণু পাচারের কোনও তথ্য থাকলে অবশ্যই যেকোনো সময় আমাকে জানানোর অনুরোধ করছি।’

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দফতরের পরিচালক মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘রেণু পোনা শিকারের সময় ৩৬ প্রজাতির জলজ প্রাণী ধ্বংস করা হয়। এ কারণে রেণু শিকার অবৈধ ঘোষণা করেছে সরকার। রেণু যাতে ধরা না হয় সেজন্য মৎস্য দফতরও কাজ করছে। তবু একটি চক্র গোপনে পাচার করছে।’

 

বার্তা বাজার/এমএমএইচ

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
পরবর্তী সংবাদ আসছে...
লিংক কপি হয়েছে!
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন