উন্নত জীবনের স্বপ্নে এক দশক আগে সুদূর প্রবাস মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বহুরিয়া ইউনিয়নের চান্দুলিয়া গ্রামের ফালু সিকদারের ছেলে রাসেল সিকদার। ইচ্ছা ছিল পরিবারকে একটি সুন্দর ও স্বাবলম্বী ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এক অচেনা ভুল ও দীর্ঘ আইনি জটিলতায় হারিয়ে গিয়েছিলেন জীবনের আলো থেকে। অবশেষে পরিবার ও উপজেলা প্রশাসনের প্রচেষ্টায় দীর্ঘ এক বছরের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে সুস্থ অবস্থায় নিজ ভিটায় ফিরেছেন রাসেল।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১০ বছর আগে মালয়েশিয়ায় গিয়ে কয়েক বছর বৈধভাবে একটি কোম্পানিতে কাজ করেন রাসেল। তবে পরবর্তীতে সেখানে সুযোগ-সুবিধা ও প্রত্যাশিত বেতন না পেয়ে বাধ্য হয়ে অবৈধভাবে বিভিন্ন কাজ শুরু করেন। এরই মধ্যে পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই তা নবায়নের (রিনিউ) জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। নিয়ম অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে তিনি তা পাননি।
এরই মধ্যে একদিন কাজের উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন রাসেল। দুর্ঘটনাবশত তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে সিঙ্গাপুর অংশে চলে যান। সেখানে দায়িত্বরত এক ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে পথের দিকনির্দেশনা চাইতে গেলে ওই কর্মকর্তা তার কাছে বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা দেখতে চান। আবেদন করেও পাসপোর্ট না পাওয়া এবং ভিসা না থাকায় রাসেল কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
নথিপত্র না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে সিঙ্গাপুর ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে তাকে ৮০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং সাজা শেষে আরও ৮০ দিন একটি ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়।
এদিকে টানা ১ বছর ধরে রাসেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে চরম দুশ্চিন্তা ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছিল তার হতদরিদ্র পরিবার। একপর্যায়ে স্বজনরা তার বেঁচে থাকার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন।
অবশেষে গত ১৬ জুলাই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে রাসেল সিকদারের পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ের জন্য যোগাযোগ করা হয়। বিষয়টি মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খান সালমান হাবীবকে জানানো হলে তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেন। ইউএনও বহুরিয়া ইউনিয়নের স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে রাসেলের সুনির্দিষ্ট পারিবারিক ঠিকানা উদ্ধার করেন।
পরিবারের সন্ধান পাওয়ার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত রাসেলের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হয়। পরিবারের খরচে রাসেলের দেশে ফেরার বিমান টিকিট কেটে তা মালয়েশিয়া অ্যাম্ব্যাসিতে পাঠানো হয়। সব প্রক্রিয়া শেষে গত ২৪ জুলাই রাতে রাসেল বাংলাদেশে এসে পৌঁছান এবং পরদিন সকালে মির্জাপুরে নিজ বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের কোলজুড়ে ফেরেন।
নিখোঁজ সন্তানকে ফিরে পেয়ে রাসেলের মা-বাবা ও স্বজনদের চোখে এখন আনন্দের অশ্রু। দীর্ঘদিনের উৎকণ্ঠা শেষে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে তারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত সহায়তার জন্য উপজেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
রাসেলের মা বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার কোল আবার ভইরা দিছে! একটা বছর প্রতিটা দিন-রাইত কানতে কানতে চোখের পানিও শুকায়া গেছিল। ভাবছিলাম পুত আমার আর বাইচা নাই, জীবনে আর কোনোদিন তারে দেখতে পামু না। আজ যহন পুত আমার সামনে আইসা দাঁড়াইল, তারে বুকে জড়াইয়া ধরলাম। মনে হইলো আবার নতুন কইরা জীবন পাইলাম। স্যারদের (ইউএনও ও প্রশাসন) অবদান আমি কোনোদিন ভুলুম না, তাদের জন্যই আজ আমার ছেলেটা আবার আমার কোলে আইসা ফিরছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান সালমান হাবীব বলেন, দূতাবাস থেকে আমাদের কাছে ওই যুবকের তথ্য জানতে চাওয়া হলে খোঁজ নিয়ে তার পরিবারের সন্ধান পাই। পরে যোগাযোগ করে তার পরিবারের মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করে তা দূতাবাসে পাঠানো হলে ওই যুবককে দেশে ফেরানো হয়। সে ভবিষ্যতে বৈধ পথে বিদেশ যেতে চাইলে সরকারিভাবে তাকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশ পাঠানো সম্ভব হবে। এছাড়া আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকারি সহায়তার কথাও জানান এই কর্মকর্তা।






