এইচএসসি পরীক্ষার ব্যবহারিক পরীক্ষাতেও কি চলছে টাকার খেলা? নীলফামারীর ডিমলায় ব্যবহারিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ‘টাকা না দিলে নম্বর কমে যাবে’, এমনকি ‘ফেল করিয়ে দেওয়া হতে পারে’ এমন ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক পরীক্ষার্থী। শুক্রবার ডিমলা ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে মনোবিজ্ঞান বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষায় ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজের পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর আগে একই বিষয়ের ব্যবহারিক খাতা ও শিটের নামে জনতা ডিগ্রি কলেজের পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩৩০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) ডিমলা ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে মনোবিজ্ঞান বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজের প্রায় ২০৮ জন এবং জনতা ডিগ্রি কলেজের ৪২ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজের পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০ টাকা এবং জনতা ডিগ্রি কলেজের পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩৩০ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে পরীক্ষাকেন্দ্রে দেখা যায়, ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজের অফিস সহকারী মো. মজনুর রহমান পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। মোছা. মৌসুমী আক্তার, আরফিন আক্তারসহ একাধিক পরীক্ষার্থীও ৫০ টাকা করে দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেন।
পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর দেওয়ার বিষয়টি সামনে রেখে তাদের ওপর চাপ তৈরি করা হয়। টাকা না দিলে নম্বর কম দেওয়া কিংবা পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও টাকা দিতে হয়েছে বলে দাবি তাদের।
তবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. মজিনুর রহমান। তিনি বলেন, “আমি কোনো টাকা নেইনি। ভালোভাবে জিজ্ঞেস করেন কিসের টাকা দিছে।” পরে তিনি কেন্দ্র ফি দেওয়ার কথা বলে দ্রুত পরীক্ষাকেন্দ্র ত্যাগ করেন।
জনতা ডিগ্রি কলেজের কয়েকজন পরীক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বৃহস্পতিবার তাদের কলেজে মনোবিজ্ঞান প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য ৩৩০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, দুটি শিট দেওয়া হয় এবং ওই শিট দেখে তারা পরীক্ষা দেন। টাকা না দিলে কী হতো, তা তারা জানেন না। তবে শিক্ষক তাদের বলেছেন, “তোমরা টাকা দাও, নম্বর দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।”
অভিযোগের বিষয়ে জনতা ডিগ্রি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিষয়ের প্রদর্শক সামিউল আলম লেনিন বলেন, “প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের ব্যবহারিক খাতা ৪৫ টাকা করে ৯০ টাকা এবং শিট ফটোকপি বাবদ ৩০ টাকা নিয়েছি।” অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের তাঁর সামনে হাজির করার কথা বলেন।
ঘটনার অনুসন্ধানে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজের অফিস সহকারী মো. মজনুর রহমানের পাশে ডিমলা ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিষয়ের প্রভাষক রেজাউল কবির উপস্থিত হন। তিনি বার্তা বাজারের প্রতিবেদকসহ সঙ্গে থাকা অপর এক গণমাধ্যমকর্মীকে জোর করে অধ্যক্ষের কক্ষে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
পরে সাংবাদিকদের ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজের কেন্দ্র সচিবের কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে জনতা ডিগ্রি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিষয়ের প্রদর্শক সামিউল আলম লেনিনকে ডেকে আনা হয়। এ সময় ব্যবহারিক খাতার টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সংবাদ না করার জন্য সাংবাদিকদের অনুরোধ করা হয়। এমনকি সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদের টাকা দেওয়ার চেষ্টাও করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ডিমলা ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজের কেন্দ্র সচিব ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শহীদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “অবশ্যই এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইলিগ্যাল (অবৈধ)। যে ভুলটা হয়ে গেছে, তা যেন আগামীতে আর না হয় এ জন্য আপনাদের সহযোগিতা চাই। কলেজের ভাবমূর্তির বিষয় আছে, এখানে আমারও দায়িত্ব রয়েছে। যদিও আমার কেন্দ্রে উপস্থিত থাকার কথা ছিল, কিন্তু বাড়িতে পরীক্ষার্থীদের খাতা মূল্যায়ন করছিলাম। এ কারণে কেন্দ্রে উপস্থিত হতে পারিনি।”
ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, “আমার স্ট্রং সিদ্ধান্ত হলো, কোনো শিক্ষার্থী এক টাকা কাউকে দেবে না, কেউ নেবেও না।” তাঁর দাবি, ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে তাঁর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কেউ প্রতিনিধিত্ব করার এখতিয়ার রাখে না।
এ প্রসঙ্গে ডিমলা ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি প্রিন্স লিমন বলেন, “সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো অর্থ আদায় করা প্রতারণার শামিল। বর্তমান সরকার শিক্ষাবান্ধব নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর পরও কোনো প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক-কর্মচারী অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে তা সরকারি সিদ্ধান্তের সরাসরি পরিপন্থী।” এমন অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও শাস্তির দাবি জানান তিনি।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “সরকার নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুক্রবার প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা কেন নিল এবং ৫০ টাকা করে কেন নেওয়া হলো, এ বিষয়ে প্রিন্সিপালকে ডেকে বিস্তারিত জানব। প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”






