জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষির চিত্র বদলে গেছে। অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও মাটির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় বছরে একবার ধান ফলানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে শুধু ধানের আয়ে সংসার চালানো সম্ভব না হওয়ায় কৃষকেরা একই জমিতে ধান, মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষের দিকে ঝুঁকেছেন।
এই পদ্ধতিতে জমির পানিতে মাছ, মাঠে ধান এবং ঘেরের পাড়ে লাউ, করলা, শসাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করা হয়। একটি খাতে ক্ষতি হলেও অন্য খাত থেকে আয় হওয়ার সুযোগ থাকায় এটিকে জলবায়ু সহনশীল কৃষি পদ্ধতি হিসেবে উৎসাহিত করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মৎস্য বিভাগ।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সাতক্ষীরায় সমন্বিত চাষের পরিধি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, এই অভিযোজন ব্যবস্থাই এখন বিদ্যুৎ নীতির জটিলতায় পড়েছে।
কৃষি থেকে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’: সরকারের সেচ নীতিমালা-২০২৬ অনুযায়ী ধান ও মৌসুমি সবজির জন্য কৃষি সেচে বিশেষ বিদ্যুৎ হার ও ভর্তুকি রয়েছে। কিন্তু একই জমিতে ধান, মাছ ও সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের শ্রেণি কী হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় মাঠপর্যায়ে অনেক সংযোগকে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
তাঁদের দাবি, এতে কৃষি সেচের প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৮০ পয়সার পরিবর্তে ১৩ টাকা ৪৯ পয়সা হারে বিল আসছে। পাশাপাশি বন্ধ হয়েছে ২০ শতাংশ সরকারি ভর্তুকিও।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার নিলেখালীর কৃষক নারায়ণ সরকার বলেন, “আগে যে বিল দিতাম, এখন তার কয়েক গুণ বেশি দিতে হচ্ছে। আমরা আগের মতোই চাষ করছি, মাছ বাঁচাতে মেশিন চালাচ্ছি। কিন্তু বিল আসছে যেন শিল্পকারখানা চালাই। এভাবে চললে সমন্বিত চাষ বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।”
এক মাসে বিল প্রায় চার গুণ: মাছের ঘেরে অক্সিজেনের ঘাটতি রোধে অনেক কৃষক এয়ারেশন মেশিন ব্যবহার করেন। বিশেষ করে গরম বা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সময় এই প্রযুক্তি মাছ বাঁচাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপজেলা ও জেলা মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এয়ারেশন কোনো শিল্পকারখানার যন্ত্র নয়; এটি মাছ উৎপাদনের সহায়ক কৃষি প্রযুক্তি।
নিলেখালীর কৃষক বিভূতি সরকারের বিদ্যুৎ বিলের কপিতে দেখা যায়, জুন মাসে ১ হাজার ২০০ ইউনিট ব্যবহারে বিল হয়েছিল ৬ হাজার ২৪০ টাকা। জুলাইয়ে ব্যবহার বেড়ে ১ হাজার ৭১০ ইউনিট হলেও সংযোগ ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ হিসেবে দেখিয়ে বিল আসে ২৩ হাজার ৬৮ টাকা।
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যয় কমাতে অনেকে রাতে এয়ারেশন মেশিন চালানো কমিয়ে দিচ্ছেন, যা মাছ মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
আবেদন করেও মিলছে না সমাধান: কৃষকদের মতে, বিদ্যুৎ সংযোগের শ্রেণি পরিবর্তনের পর পুরোনো সেচ সংযোগের সনদ, বিদ্যুৎ বিল এবং কৃষি বা মৎস্য দপ্তরের প্রত্যয়নপত্র দিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে আবেদন করলেও অনেক ক্ষেত্রে সমাধান মিলছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স জননী ইন্টারন্যাশনালের ঠিকাদার শেখ মগফুর রহমান বলেন, সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতে সংযোগের শ্রেণি নির্ধারণ করা হচ্ছে। নোটিশ ও যোগাযোগে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, যা ধীরে ধীরে সংশোধন করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মুহা. আজিজুর রহমান সরকার বলেন, “একই মিটার দিয়ে একাধিক উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার হলে নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ হারের শ্রেণি কার্যকর হয়। তবে কোনো গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত মনে করলে লিখিত আবেদন করলে পুনর্বিবেচনা করা হবে।”
সাতক্ষীরার নাগরিক নেতা মাধব দত্ত বলেন, “উপকূলে এখন সমন্বিত চাষ ছাড়া কৃষকের টিকে থাকার উপায় নেই। এটিকে শিল্প হিসেবে ধরলে কৃষকও বাঁচবে না, কৃষিও বাঁচবে না।”
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, সমন্বিত চাষে ব্যবহৃত বিদ্যুৎকে কৃষি সেচের আওতায় এনে নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। পাশাপাশি সংযোগের শ্রেণি পুনর্মূল্যায়ন, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সেচ ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ সমন্বয়েরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষকেরা যখন বহুমুখী কৃষির দিকে এগোচ্ছেন, তখন সেই অভিযোজন ব্যবস্থার সঙ্গে বিদ্যুৎ নীতির সমন্বয়ও জরুরি হয়ে উঠেছে।






